তুরস্কে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের মহাসচিবকে এমন একটি প্রশ্ন করা হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন ছিল, যদি ভবিষ্যতে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তাহলে জোটের প্রতিষ্ঠা চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তুরস্কের প্রতিরক্ষায় কি জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এগিয়ে আসবে? প্রশ্নটি ছিল স্পষ্ট, কিন্তু উত্তরে মহাসচিব কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং তিনি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আগাম মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন এবং তুরস্কের রাষ্ট্রপতিকে একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, তুরস্কের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এমন কোনো পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে সাংবাদিকরা পুনরায় জানতে চান, যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব না হয়, তাহলে জোটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি কার্যকর হবে? এ প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর না দিয়ে মহাসচিব বলেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করা ঠিক হবে না।
আরও এক সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেন, যদি ইসরায়েলের পদক্ষেপে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে, তাহলে জোটের অবস্থান কী হবে? জবাবে মহাসচিব ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সেই সংঘাতের সূচনার ঘটনাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এরপরও সাংবাদিকরা একই প্রশ্ন পুনরায় করলে তিনি স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, জোটের প্রতিরক্ষা চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ থাকলেও সেটি প্রতিটি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের নিশ্চয়তা দেয় না। কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলার প্রকৃতি, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক সামরিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত গুরুত্বের কারণে জোটের অন্যতম প্রধান সদস্য। কৃষ্ণসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইসরায়েল জোটের সদস্য না হলেও পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। ফলে দুই দেশের মধ্যে কোনো সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি এবং জোটও এমন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেয়নি। তাই সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো ছিল সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতিকে ঘিরে। মহাসচিবের বক্তব্যও সেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কূটনৈতিক সতর্কতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে বাস্তব কোনো সংঘাত দেখা দিলে তখনকার রাজনৈতিক, সামরিক ও আইনি পরিস্থিতি বিবেচনা করেই জোটের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।
তুরস্ক–ইসরায়েল সম্ভাব্য সংঘাতে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, স্পষ্ট উত্তর এড়ালেন মহাসচিব
