পরিত্যক্ত সেই খেজুর বৃক্ষের খুঁটি থেকে শিশুর মতো অঝোরে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসছিল; প্রিয়তম রাসূল (ﷺ)–এর বিরহে সেই খেজুর খুঁটির কান্না ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো মসজিদ আল নববী শরীফ জুড়ে। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, স্বয়ং রাসূলে পাক (ﷺ) সেই খুঁটিতে হাত বুলিয়ে দিলে তবেই তার কান্না থেমে যায়—আহ! একটি গাছও প্রিয় রাসূল (ﷺ)–এর বিরহে কেঁদেছিল, তাঁর বিচ্ছেদের বেদনা গাছের বুকেও ঢেউ তুলেছিল। গোটা মদিনায় কান্নার রোল: আল্লাহর রাসূল (ﷺ)–এর ওফাতের পর অন্যান্য সাহাবীদের মতো শোকে স্তব্ধ হয়ে যান হযরত বেলাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। তিনি এতটাই শোকাহত হয়ে পড়েন যে আর আযান দিতে পারেননি। যে মাদিনা নগরীতে তিনি ছুটে এসেছিলেন প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে, দিন-রাত কাটতো যার নূরানী চেহারা দেখে—আজ তিনি নেই! এই বেদনাহত হৃদয় নিয়ে একসময় তিনি মদিনা ছেড়ে চলে যান। অনেক দিন পর স্বপ্নে তিনি রাসূল (ﷺ)–কে দেখলেন; প্রিয় নবী তাঁকে বলছেন, “বিলাল, এতদিনেও কি তোমার সময় হয়নি আমার রওজায় আসার?” প্রায় ছয় মাস পরে তিনি ফিরে এলেন প্রিয় মদিনায়, ছুটে গেলেন রাসূল (ﷺ)–এর রওজায়, দরুদ ও সালাম পেশ করলেন। মদিনাবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সেই হৃদয়স্পর্শী আযান শোনেননি, তাঁরা অনুরোধ জানালেন—একবার আযান দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, রাসূল (ﷺ)–এর জন্য যে আযান দিতেন, তা আর কারো জন্য দেবেন না। অবশেষে হযরত ওমর (রাঃ) আনহুর অনুরোধে তিনি আযান শুরু করলেন। সেই আযানের ধ্বনি, সেই মধুর স্মৃতি—সব যেন ফিরে এলো একসাথে; মুহূর্তের জন্য মদিনাবাসীরা ভাবলেন, যেন রাসূল (ﷺ) আবার ফিরে এসেছেন। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সবাই। আর যখন তিনি “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” উচ্চারণে পৌঁছালেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন—পুরো মদিনা নগরী কান্নার ধ্বনিতে ভরে উঠল। আহ! তাদের হুব্বে রাসূল কেমন ছিল! আমাদের অন্তরে কি সেই ভালোবাসা আছে? থাকলেও কতটুকু? তিনটি কাজ মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ: আবদুর রহমান ইবনে আলা হাদরামি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন—“এই উম্মতের শেষ যুগে এমন এক দল আসবে, যাদের নেক আমলের সওয়াব প্রথম যুগের লোকদের সমতুল্য হবে; তারা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং ফিতনাবাজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে।” রাসূলপ্রেমই মুক্তির পথ: প্রিয় নবী (ﷺ)–এর জীবনগাঁথা শুনে কি আমাদের অন্তরে তাঁর ভালোবাসা জাগে? আমরা কি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসতে পেরেছি? তাঁর সুন্নাতের প্রতি ভালোবাসা কি আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে? তাঁকে স্মরণ করলে কি আমাদের চোখ অশ্রুসজল হয়, অন্তর কাঁদে? সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে কি আমরা তাঁর ভালোবাসাকে স্থান দিতে পেরেছি? তাঁর স্মরণ কি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে? তাঁর প্রতিটি সুন্নাত পালন কি আমাদের অন্তরে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়? তাঁর অনুপম আদর্শকে কি আমরা জীবনের পথনির্দেশক করেছি? প্রিয় বন্ধু, এটাই মুক্তির পথ—এটাই মহান রব্বুল আলামীনকে চেনা, জানা ও ভালোবাসার প্রকৃত রাস্তা; এ-ই সাফল্যের মহাসড়ক, যার শেষ গন্তব্য আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত। قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ — “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (Quran)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী (ﷺ)–এর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণের সৌভাগ্য নসিব করুন।
