যেকোনো আধুনিক যুদ্ধের মতোই চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী ইরান-এ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র-এর হাজার হাজার হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩,৬০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১,৭০০ জনই বেসামরিক নাগরিক, আর এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কঠোর হুমকি দিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছেন; একই সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যেখানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি-এর শাসনামলে দমন-পীড়ন বেড়ে গেছে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পাশাপাশি বছরের শুরু থেকে ৬০০-র বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে; অন্যদিকে লেবানন-এ হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনীর সরাসরি সংঘাতে গত মার্চ থেকে প্রায় ২,৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং স্যাটেলাইট চিত্রে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে; এই সংঘাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ‘শক’ তৈরি করেছে—মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আর জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর কৃষি খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; কৌশলগতভাবে এই সংঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন ট্রাম্প নিজেই, কারণ জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ৩৭ শতাংশে, যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য তার নির্বাচনী সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে, একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো—সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত—যারা সংঘাত এড়াতে চেয়েছিল, তারাই এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে, বিশেষ করে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়, তবে তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; একইসঙ্গে ইউক্রেন-ও এই সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মনোযোগ ইরানের দিকে সরে যাওয়ায় ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত উন্নত অস্ত্র সরবরাহ কমে গেছে; তবে এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু শক্তি কৌশলগতভাবে লাভবান হচ্ছে—চীন তাদের বিশাল জ্বালানি মজুত ও কূটনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে রাশিয়া তেলের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি আয় প্রায় দ্বিগুণ করেছে, আর বৈশ্বিক তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জনের পথে এগোচ্ছে; একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে অস্ত্র ব্যবসাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে; সব মিলিয়ে দুই মাস আগে ট্রাম্প যে ‘দ্রুত বিজয়ের’ প্রত্যাশা করেছিলেন, তা এখন এক দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সংকটে রূপ নিয়েছে এবং বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি আত্মসমর্পণ না করে, তবে এই যুদ্ধ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
