ওয়াশিংটন: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি কন্যাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত প্রাণঘাতী হামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দুই ডজনেরও বেশি সিনেটর। সিনেটর কিরস্টেন গিলিব্র্যান্ডের নেতৃত্বে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত চূড়ান্ত করে কংগ্রেসকে বিস্তারিত অবহিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তারও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে। সিনেটরদের ভাষায়, ঘটনাটি সম্পর্কে কী ঘটেছিল, কোথায় ভুল হয়েছে এবং পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিরক্ষা বিভাগ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসব বিষয়ে অশ্রেণিবদ্ধ তথ্য গোপন রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং সামরিক অভিযানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স পূর্বে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক সামরিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাবে সংঘটিত ওই হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই সম্ভবত দায়ী ছিল। ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় অন্তত ১৭৫ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হন, যা সত্য হলে ১৯৯১ সালে ইরাকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ভুলবশত মার্কিন বোমা হামলায় চার শতাধিক বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানায়, লক্ষ্য নির্ধারণের সময় মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সম্ভবত পুরোনো ও হালনাগাদবিহীন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। একই সঙ্গে সংরক্ষিত সরকারি নথি থেকে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত একটি সামরিক কমপ্লেক্সের একেবারে পাশেই অবস্থিত ছিল, যা লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং এই মুহূর্তে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করার মতো অবস্থায় তারা নেই। মে মাসে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির পাশে স্কুলটির অবস্থানের কারণে তদন্ত অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে এবং সব তথ্য যাচাই করতে সময় লাগছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক সামরিক তৎপরতার কারণে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না। তাঁর ভাষায়, কেউ কেউ বলেছেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, কিন্তু তিনি এমন কোনো তথ্য দেখেননি যা নিশ্চিতভাবে মার্কিন বাহিনীর দায় প্রমাণ করে। অপরদিকে ইরান এই হামলাকে প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, তাদের সামরিক বাহিনী কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। এদিকে ওয়াশিংটনে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে পেন্টাগনের তদন্তের ফলাফল এখন শুধু মার্কিন কংগ্রেস নয়, আন্তর্জাতিক মহল, মানবাধিকার সংস্থা এবং যুদ্ধ আইনের বিশেষজ্ঞদের কাছেও গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে হামলার প্রকৃত দায়, গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে বেসামরিক প্রাণহানি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
