চীনের সম্ভাব্য সামরিক হামলা মোকাবিলায় নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি যাচাই করতে তাইওয়ানজুড়ে চলমান বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে শনিবার উপকূলীয় প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলার মহড়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কাওশিয়ং শহরের একটি নৌঘাঁটিতে গিয়ে তিনি একটি দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্রবাহী আক্রমণাত্মক নৌযানে আরোহণ করেন এবং সেখান থেকেই মহড়ায় অংশ নেওয়া নৌসেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। একই সময়ে উপকূল ও সমুদ্রসীমায় নিচু উচ্চতায় উড়ে যাওয়া আক্রমণাত্মক ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার প্রদর্শন করা হয়, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য শত্রু অবতরণ ও আক্রমণ ঠেকানোর একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধপরিস্থিতি অনুকরণ করা হয়।
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী বুধবার থেকে ১০ দিনব্যাপী হান কুয়াং মহড়া শুরু করেছে। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো বাস্তব সেনাসদস্য, বাস্তব ভূখণ্ড এবং প্রকৃত সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে কমান্ড কাঠামো, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, দ্রুত যুদ্ধপ্রতিক্রিয়া এবং দ্বীপটির সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরীক্ষা করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে চীনা সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবারের মহড়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাইওয়ান নিজেদের একটি গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত স্বশাসিত ভূখণ্ড হিসেবে পরিচালনা করলেও চীন দ্বীপটিকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে বলে জানিয়েছে। তাইওয়ানের সরকার অবশ্য বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
মহড়ায় অংশ নেওয়া নৌসেনাদের উদ্দেশে লাই চিং-তে বলেন, হান কুয়াং মহড়ার উদ্দেশ্য হলো বাস্তব সেনা, বাস্তব ভূখণ্ড ও বাস্তব সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে কমান্ড সমন্বয়, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং নিজ ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যাচাই করা। তিনি সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করে বলেন, বহিরাগত হুমকি ও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে তাইওয়ান সরকার দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে এবং সামরিক বাহিনী ও কোস্ট গার্ডকে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সামরিক সদস্যদের মহড়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক বোঝাপড়া যত বেশি শক্তিশালী হবে, সম্ভাব্য সংকটের সময় তত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
লাইয়ের সফরের সময় মহড়ার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ছোট আকারের, নিচু উচ্চতায় উড়তে সক্ষম আক্রমণাত্মক ড্রোনের ঝাঁক। এসব ড্রোন উপকূল ও সমুদ্রের ওপর দিয়ে একযোগে পরিচালিত হয়ে সম্ভাব্য শত্রু বাহিনীর ওপর নজরদারি ও আক্রমণের পরিস্থিতি অনুকরণ করে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহারের সুযোগ এবং একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতার কারণে এই ধরনের প্রযুক্তিকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মহড়ায় তাইওয়ানের কোস্ট গার্ডের নতুন ‘আনপিং’ শ্রেণির একটি ক্যাটামারানও অংশ নেয়। সম্ভাব্য যুদ্ধপরিস্থিতিতে শুধু নৌবাহিনী নয়, কোস্ট গার্ডকেও সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হতে পারে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তাদের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। আনপিং শ্রেণির জাহাজগুলো তাইওয়ানের নৌবাহিনীর দ্রুতগতির ও উচ্চমাত্রায় কৌশলগতভাবে চালনাযোগ্য তুও চিয়াং শ্রেণির যুদ্ধজাহাজের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী এসব জাহাজকে তাদের শক্তিশালী জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কারণে ‘বিমানবাহী রণতরির ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে।
এর আগে বৃহস্পতিবারও লাই চিং-তে একটি আনপিং শ্রেণির কোস্ট গার্ড জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা স্থাপনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাইওয়ান তার উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু প্রচলিত নৌবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল রাখতে চাইছে না; বরং কোস্ট গার্ড, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং দ্রুতগতির ছোট যুদ্ধজাহাজকে সমন্বিত করে একটি স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে।
তাইওয়ানের সামরিক প্রস্তুতির এই তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন তাইওয়ান প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বেইজিং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তেকে একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং তাঁর সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপের প্রস্তাবগুলোও প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে তাইওয়ান বলছে, নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রক্ষার জন্য তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চীনের দৃষ্টিতে তাইওয়ান একটি অখণ্ড চীনের অংশ এবং দ্বীপটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার যেকোনো পদক্ষেপকে বেইজিং অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখে। তাইওয়ান অবশ্য নিজেদের কার্যত স্বশাসিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রেখে এসেছে এবং বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে সামরিক মহড়া এখন শুধু প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির বিষয় নয়; এটি তাইওয়ান প্রণালির বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
হান কুয়াং মহড়ায় বাস্তব অস্ত্র, বাস্তব সেনাসদস্য এবং বাস্তব ভূখণ্ড ব্যবহার করে সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার অনুশীলন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকও তুলে ধরছে। অতীতে যেখানে বড় ধরনের প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেখানে ড্রোন, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগতির নৌযান, কোস্ট গার্ড এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক সংস্থার সমন্বিত প্রতিক্রিয়াকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাইওয়ানের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য সম্ভাব্য চীনা হামলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আকাশ, সমুদ্র ও উপকূল—তিনটি দিক থেকে একযোগে আসা চাপ মোকাবিলা করা। সেই কারণে এবারের মহড়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমিত সময়ের মধ্যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি কোস্ট গার্ডের মতো বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কীভাবে সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাও মহড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাইওয়ান বলছে, তাদের লক্ষ্য সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; বরং সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিরোধ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরি করা। তবে বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে তাইওয়ানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং বিদেশি সমর্থন গ্রহণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি যেমন দ্বীপটির নিরাপত্তা কৌশলের অংশ, তেমনি এটি চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণেরও প্রতিফলন।
শনিবারের মহড়ায় লাই চিং-তের উপস্থিতি তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সামরিক প্রস্তুতির প্রতি সরাসরি সমর্থনের একটি দৃশ্যমান বার্তা দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রবাহী দ্রুতগতির নৌযান থেকে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা মহড়া পর্যবেক্ষণ এবং আক্রমণাত্মক ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার দেখার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে সম্ভাব্য সংকটের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে দ্রুত, সমন্বিত এবং বাস্তব যুদ্ধপরিস্থিতির উপযোগী করে তোলাই সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
দশ দিনব্যাপী হান কুয়াং মহড়া শেষ হওয়ার পর এর ফলাফল তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ তাইওয়ান প্রণালিতে যেকোনো সামরিক সংঘাত শুধু চীন ও তাইওয়ানের জন্য নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থা এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই বাস্তবতায় তাইওয়ানের সামরিক মহড়া এখন আর কেবল একটি দ্বীপের প্রতিরক্ষা অনুশীলন নয়—এটি বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশে ড্রোন, চীনের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে তাইওয়ানের মহড়া
