দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত সেকেন্ড থমাস শোলকে ঘিরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। কয়েক দশক ধরে সার্বভৌমত্বের বিরোধে থাকা এই প্রবালপ্রাচীরকে ঘিরে গত মাসে দুই দেশের উপকূলরক্ষী বাহিনী ও সামরিক সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফিলিপাইনের দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটিতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এশিয়ার অনেক দেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যখন ব্যাপকভাবে ব্যস্ত, তখন চীনকে প্রতিহত করতে ওয়াশিংটন বাস্তবে কতটা সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত? ইরান সংঘাতের কারণে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে এশীয় মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই সময়ে চীন নিজের কৌশলগত সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে জুলাইয়ের শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদন এসেছে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যেই জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় দুটি মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনা ওঠায় এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি ও প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস সতর্ক করে বলেছেন, এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বড় ধরনের ব্যর্থতায় পরিণত হলে তা চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধায় রূপ নিতে পারে এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে পিছু হটছে না। বরং তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও জাপানকে ঘিরে বিস্তৃত প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল বরাবর প্রতিরোধমূলক সামরিক অবস্থান বজায় রাখাই প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ১০ আগস্ট ম্যানিলায় মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক উপমন্ত্রী এলব্রিজ কোলবি সেই কৌশল পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে চীনের সামরিক চাপ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয়, সামরিক সমন্বয় জোরদার এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এশীয় মিত্রদের মধ্যে নতুন ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নীতিই ভবিষ্যতে আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য বড় চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে এশিয়ায় মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রশাসনগুলো সেই পথ থেকে সরে আসায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন অর্থনৈতিক কৌশলের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা মিরা র্যাপ-হুপার বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরাসরি সংঘাতের মধ্যে আটকে যেতে চায় না। একই সঙ্গে তারা চীনের একক আঞ্চলিক আধিপত্যও চায় না। তাদের লক্ষ্য হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ছে—এমন ধারণা শক্তিশালী হলে সেই ভারসাম্য ক্রমেই চাপের মুখে পড়তে পারে। ট্রাম্পের পরিবর্তিত চীন নীতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একসময় বেইজিংকে প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরলেও চীনের পাল্টা শুল্ক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপের পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন সমঝোতা ও সহযোগিতার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের উদ্যোগ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এমন ধারণা জোরদার করতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিবর্তে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমঝোতার কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ধারণা এ উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এশিয়ার ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের যেকোনো বড় পরিবর্তন তৈরি করছে কঠিন কৌশলগত দ্বিধা। ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো চীনের সামুদ্রিক চাপ মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সহযোগিতা চায়, কিন্তু একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতেও আগ্রহী। ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড হেডারিয়ান বলেছেন, ম্যানিলা এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে আটকে আছে যেখানে তারা একই সঙ্গে দুই পরাশক্তির সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা, তাইওয়ানের কাছাকাছি ফিলিপাইনের কৌশলগত ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন সেগুলোও পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একই সময়ে জাপানের সঙ্গে ফিলিপাইনের সামরিক সহযোগিতা বাড়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, ম্যানিলা শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ চীন সাগর আর কেবল চীন ও ফিলিপাইনের ভূখণ্ডগত বিরোধের ক্ষেত্র নয়; এটি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক অগ্রাধিকার, চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি, এশীয় মিত্রদের কৌশলগত স্বাধীনতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যের পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল—মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক—সামলাতে হবে। আর এখানেই এশীয় মিত্রদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে: যুক্তরাষ্ট্র কি একই সময়ে দুই অঞ্চলে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারবে, নাকি চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির সামনে এশিয়ায় ধীরে ধীরে এমন এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে, যেখানে বেইজিং আরও বেশি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করবে?
