—বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে বাস্তবে তাদের ফেরত পাঠানোর পথ এখনো অনিশ্চিত। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার স্পষ্ট করেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে না।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের পর ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বসবাস করছে। একই সময়ে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, যাচাই করা তালিকায় থাকা আরও ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় বা নাগরিকত্ব যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব তথ্যের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়াই সংকটের স্থায়ী সমাধানের মূল পথ।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা। সেখানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। আরাকান আর্মি রাখাইন অঞ্চলের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকাসহ রাখাইনের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল।
মিয়ানমার বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এই প্রক্রিয়া দুই দেশের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু তালিকা যাচাই বা প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই দেশ প্রত্যাবাসনের জন্য একাধিক উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা কার্যকরভাবে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেনি।
এরই মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সম্মতি জানিয়েছে। তবে মালয়েশিয়া সতর্ক করে দিয়েছে, প্রত্যাবাসনের ফলে রোহিঙ্গাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লে সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হবে না। ফলে মিয়ানমারের স্বীকৃতির ঘোষণার পরও মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে—রাখাইনে কি এমন নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের জীবন, সম্পত্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা রেখে ফিরে যেতে পারবেন?
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে রাখাইনের সংঘাত অব্যাহত থাকলে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে তাই প্রত্যাবাসনের চূড়ান্ত অগ্রগতি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ; কিন্তু প্রত্যাবাসনের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে রাখাইনে নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও মর্যাদাপূর্ণ বসবাসের নিশ্চয়তার ওপর। সেই পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ঘোষণা বাস্তব প্রত্যাবর্তনে রূপ নেবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: রয়টার্স;
বাংলাদেশে আশ্রিত ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে স্বীকৃতি দিল মিয়ানমার
