যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মাত্রার ‘চূর্ণকারী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন এবং সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে কোনো দেশ সহায়তার হাত বাড়ালে তাকেও কঠোর আর্থিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে; ট্রাম্পের ঘোষণাকে ওয়াশিংটন থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো পাল্টা অবস্থান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়া ও সামরিক সক্ষমতা বিপর্যস্ত হওয়ার দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, নতুন পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিরই সম্প্রসারণ; একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হতে পারে চীন, পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে স্থল ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকা ইরাক ও তুরস্কও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা, যদিও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি বিশ্ববাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেললেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের ক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং ইরান সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে জনগণকে রাষ্ট্রের চারপাশে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে; সাবেক ইরানি কূটনীতিক ও তেহরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক আব্বাস কামায়ারও দাবি করেছেন, ট্রাম্পের ধারাবাহিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হুমকি ইরানের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টির পরিবর্তে উল্টো জনগণের মধ্যে ঐক্য বাড়াচ্ছে; এদিকে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌপরিবহন ব্যবস্থায়, কারণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি এবং বুধবার মাত্র নয়টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে কেপলার ডেটা উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে; গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১ দশমিক ৮৭ ডলারে স্থির রয়েছে; একই সময়ে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের ওপর শতাধিক হামলা হয়েছে এবং এতে প্রায় ১০০ যোদ্ধা নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়েছেন, যা সংঘাতের আঞ্চলিক বিস্তারের মাত্রা স্পষ্ট করছে; অন্যদিকে সিরিয়ার ভূখণ্ডেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি ইদলিবের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার কোনো বৈধতা ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন এবং ইসরায়েলের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে সেখানে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তুতি চলছিল; তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানঘাঁটিটি মূলত ফাঁকা ছিল এবং যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে ও অবকাঠামো পুনর্বাসনের কাজ চলছিল, আর তুর্কি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ; এর কয়েক দিন আগে ইসরায়েলের মোসাদপ্রধান সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ফোনে আলোচনা করেছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; লেবাননেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে এবং কয়েকটি স্থানে গোলাবর্ষণের পাশাপাশি বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংসের অভিযান চালানো হয়েছে বলে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে; একই সময়ে ফ্রান্স লেবাননের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে এবং আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে লেবাননের সামরিক বাহিনীকে সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে; অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, যেখানে গ্রেপ্তার, বাড়িতে অভিযান, ভূমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে; ফলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান এখন কেবল ওয়াশিংটন–তেহরান দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এর প্রভাব চীন, তুরস্ক, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং লেবানন–সিরিয়া–ফিলিস্তিনসহ বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে; কূটনৈতিক সমঝোতার পথ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ, ইরানের প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকাকে ঘিরে এই সংঘাত একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
