সিরিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। গত ১৮ আগস্ট সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, সিরিয়ায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা ঠেকাতেই হামলাটি চালানো হয়েছে। অন্যদিকে আঙ্কারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামলাকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ভোরে আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে অন্তত আটটি ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়। এতে রানওয়ে ও সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে একটি তুর্কি প্রতিনিধিদল ওই ঘাঁটি পরিদর্শন করেছিল বলে সিরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিষয়টি ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক ভুল বোঝাবুঝি বা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ইসরায়েলের বক্তব্য, সিরিয়ার নতুন প্রশাসন আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে বিদ্যমান নিরাপত্তা-ব্যবস্থা পরিবর্তনের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক মোতায়েনকে ইসরায়েল নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। তবে তুরস্ক এই ব্যাখ্যাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি আরও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আবু আল-দুহুরে কোনো স্থায়ী তুর্কি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘাঁটিটি মূলত সিরীয় বিমানবাহিনীর ব্যবহারের জন্য পুনর্বাসন করা হচ্ছিল এবং তুর্কি সামরিক কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন।
তবে তুরস্কের সিরিয়ায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যে বাড়ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আঙ্কারা সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সহায়তার মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক এক ফোনালাপে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল-শাইবানি তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে Reuters জানিয়েছে। ওই আলোচনার কয়েক দিনের মধ্যেই আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে হামলা হয়। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা এখন ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুরস্কের পক্ষ থেকে সিরিয়ায় গোপনে বিপুল অস্ত্র পাঠানো এবং এমআইটি-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তা পরিচালিত হওয়ার বিভিন্ন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বর্তমান পর্যায়ে এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন না করে সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতি ও আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবের অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
তবে তুরস্ক যদি সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তার সামরিক অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করে এবং ইসরায়েল তা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে সিরিয়ার আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে দুই দেশের স্বার্থ ক্রমেই পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয় হয়েছে। মার্কিন সিরিয়া-বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক জানিয়েছেন, তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে ‘ডি-কনফ্লিকশন’ বা সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। তাঁর মতে, সামরিক যোগাযোগের অভাব থেকে ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—আঙ্কারা কি কেবল সিরিয়ার নতুন সরকারকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার পথে এগোচ্ছে, নাকি ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ মোকাবিলায় আরও বড় প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলছে? একই সঙ্গে ইসরায়েলও কি তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে ঠেকাতে সিরিয়ার ভূখণ্ডে আরও হামলা চালাবে?
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলছে, সিরিয়া এখন শুধু ইসরায়েল ও নতুন সিরীয় সরকারের সংঘাতের ক্ষেত্র নয়; এটি ধীরে ধীরে ইসরায়েল–তুরস্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। আবু আল-দুহুর হামলার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোই নির্ধারণ করবে এই উত্তেজনা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে এগোবে।
ইসরায়েলি হামলার পর সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা
