ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকিকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার বলেছেন, ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্ব আবারও ‘পূর্ণাঙ্গ ঔপনিবেশিকতার’ পুরোনো বাস্তবতার দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। বাঘাইয়ের ভাষায়, কোনো রাষ্ট্রই বিদেশি ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিমানবন্দরকে ইরানের সঙ্গে বৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করার অধিকার রাখে না। তাঁর এই মন্তব্য এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান পরিচালনার হুমকি দেওয়ার পর। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত যেকোনো দেশের প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক ব্যবস্থাকে ‘তীব্র অর্থনৈতিক পরিণতি’র মুখোমুখি হতে হবে। এর পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও কঠোর করে বলেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতিকে ভেঙে দেওয়া এবং অন্য দেশগুলোকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকার অথবা ইরানের সঙ্গে থাকার মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা। তেহরান অবশ্য এই চাপকে নতুন কোনো কৌশল হিসেবে দেখছে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, দেশটি কয়েক দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে এবং অতীতের অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যে এ ধরনের চাপ দিয়ে ইরানকে নত করা সম্ভব হয়নি; তাঁর দাবি, নতুন ব্যবস্থাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। ইরানি নেতৃত্বের এই কঠোর অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সামরিক উত্তেজনা নতুন করে গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় দেশটির তেল পরিবহন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা শুধু ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে তারা ছাড় দেবে না। ফলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক অবরোধ, তেল পরিবহন সংকট এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা এখন একই সংঘাতের পরস্পর সম্পর্কিত অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা তৃতীয় দেশগুলোর ওপরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করবে না; বরং ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে ইরান যদি পাল্টা হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত রাখে এবং তেল রপ্তানি ও সামুদ্রিক পরিবহনে আরও কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যুদ্ধও ক্রমেই প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। ট্রাম্প শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর প্রশাসন সংঘাতের পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; কিন্তু শান্তি আলোচনা স্থবির, নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর এবং সমুদ্রপথে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তেহরানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রকাশ্য প্রতিবাদ এবং ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হুমকি এখন সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
