ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতের উত্তেজনা দ্রুত বাড়ার মধ্যেই সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান সোমবার জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, ইয়েমেনের সংঘাত এবং হুথিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে হুথিদের হামলার আশঙ্কা এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের কয়েক দিন আগে সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন বলে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলায় সম্মতি দেননি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এদিকে হুথিরা সৌদি আরবের শহর ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে তাদের হামলা জোরদার করার পাশাপাশি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য যোগাযোগের একটি পথ হওয়ায় সেখানে সামরিক সংঘাতের বিস্তার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়লে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক হুথি তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যে নতুন একটি সংঘাতক্ষেত্র তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে সামরিক অগ্রসরতা আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তাকে সরাসরি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতিটি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল পরিবহন ব্যবস্থা আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই নৌপথে যেকোনো বড় ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। জেদ্দায় সৌদি যুবরাজ ও মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের প্রধানের বৈঠক তাই শুধু দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাত, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং হুথিদের সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হলে ওয়াশিংটন কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের অন্যতম প্রধান আগ্রহের বিষয়। তবে সরাসরি মার্কিন হামলার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার যে অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে ওয়াশিংটন একই সঙ্গে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে এবং সরাসরি নতুন সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এরই মধ্যে ইয়েমেন, সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকা, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। পরিস্থিতির যেকোনো নতুন পরিবর্তন সৌদি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, তেল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
