ব্রিটেন ও কেনিয়ার দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্বে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় ব্রিটেন আগামী সেপ্টেম্বর মাসে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা একটি যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভবিষ্যৎ, বিদেশি সেনাদের আইনি জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সূত্রগুলোর মতে, মতবিরোধের মূল কারণ হলো দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আইনি কাঠামো। এই চুক্তির মাধ্যমে কেনিয়ায় অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনাদের কার্যক্রম, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়। তবে কেনিয়ার পক্ষ চুক্তির কিছু ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে, বিশেষ করে বিদেশি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কীভাবে তদন্ত ও বিচার হবে, তা নিয়ে আরও স্পষ্ট বিধান চাওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কয়েক দশক ধরে কেনিয়ার মধ্যাঞ্চলের নানিউকি এলাকায় তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ব্যবহার করে আসছে। বিস্তীর্ণ খোলা এলাকা ও অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে এই অঞ্চল ব্রিটিশ সেনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে কেনিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া, যুদ্ধকৌশল উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই কেনিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের বিষয়। দেশটির আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করে আসছেন, বিদেশি সেনাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ উঠলেও বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সংসদীয় আলোচনায় অনেক সদস্য বিদেশি সেনাদের কর্মকাণ্ডের ওপর আরও কার্যকর আইনি নজরদারি এবং স্বচ্ছ তদন্ত ব্যবস্থার দাবি জানান।
কেনিয়ার সংসদে আলোচনার সময় কয়েকজন সদস্য বলেন, দেশের জনগণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যেখানে বিদেশি সেনারা দেশের আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পারেন। তাদের মতে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা উচিত হবে না।
অন্যদিকে ব্রিটেন জানিয়েছে, কেনিয়ার সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, অতীত ও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সামরিক উপস্থিতিকে ঘিরে কিছু বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এবং এসব বিষয়ে তারা দুঃখ প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে লন্ডন বলেছে, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং যৌথ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ কেবল একটি সামরিক মহড়া বাতিলের ঘটনা নয়; বরং এটি বিদেশি সামরিক উপস্থিতি, স্বাগতিক দেশের বিচারিক ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক দেশের ক্ষেত্রেই এখন বিদেশি সেনাদের জন্য বিশেষ আইনি সুবিধা পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হচ্ছে, আর কেনিয়ার ঘটনাও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতে কেনিয়ায় ব্রিটিশ সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কয়েক দশকের পুরোনো সামরিক সহযোগিতার কাঠামো নতুন শর্ত, কঠোর জবাবদিহি এবং সংশোধিত আইনি ব্যবস্থার আওতায় পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এবং চলমান মতপার্থক্য সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
কেনিয়ার আইনি আপত্তিতে থমকে গেল ব্রিটিশ সামরিক মহড়া, নতুন সমঝোতার অপেক্ষা
