বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, আইনজীবী ও গবেষকদের বক্তব্যে যেমন গুরুতর নিরাপত্তা ও জবাবদিহির ঘাটতির কথা উঠে এসেছে, তেমনি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি—কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, বাংলাদেশে মাদ্রাসাভিত্তিক যৌন নির্যাতনের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি বা মানবাধিকারভিত্তিক আলাদা জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সাধারণত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সংগ্রহ করে সামগ্রিক হিসাব তৈরি করে; কিন্তু ঘটনাটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নাকি মাদ্রাসায় ঘটেছে—এভাবে নিয়মিত পৃথক তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে মাদ্রাসায় মোট কতটি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার নির্ভুল মাসভিত্তিক বা বছরভিত্তিক সংখ্যা বর্তমানে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক মামলায় মাদ্রাসার শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শিশু ও শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে পুলিশ তাকে আটক করে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে আট বছর বয়সি এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে র্যাব। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ওয়াশরুমে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। নেত্রকোনায় এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১১ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এবং পুলিশ জানায়, ওই শিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চে গাজীপুরের শ্রীপুরে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেয়। একই বছরে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় একটি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা কোনোভাবেই পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না; তবে অভিযোগগুলোর ধরন থেকে শিশু সুরক্ষা, আবাসিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ক্ষমতার ভারসাম্য, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৩১৯টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৬৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর ৩০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে সংগঠনটির হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা এবং এর মধ্যে ২৩৮ শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সংখ্যাকে মাদ্রাসাভিত্তিক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো দেশের সামগ্রিক ধর্ষণসংক্রান্ত হিসাব। জুলাই মাসেও ধর্ষণের বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য হলো, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাই মোট বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র নয়, কারণ সামাজিক চাপ, ভয়, পারিবারিক সংকট, প্রতিষ্ঠানগত প্রভাব এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা পরিসংখ্যান না থাকলেও তাদের পর্যবেক্ষণে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির একটি বড় অংশ মাদ্রাসায় ঘটছে বলে তারা মনে করেন। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তিনি ছেলে শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয় এবং অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে না আসায় বাস্তব সংখ্যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে। তবে এসব বক্তব্যকে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থায় অপরাধের প্রকৃত হার সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একাংশ স্বীকার করেছেন যে যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটে এবং এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের অভিযোগ, কিছু সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কনটেন্টে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে পুরো কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে। বেফাক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের আওতাধীন নিবন্ধিত মাদ্রাসাগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা রয়েছে এবং বিশেষ করে মহিলা ও আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৫ হাজার নিবন্ধিত কওমি মাদ্রাসার পাশাপাশি আরও প্রায় ১৫ হাজার অনিবন্ধিত কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। এই তথ্য সঠিক হলে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাঠামো রয়েছে এবং প্রমাণিত অভিযোগের ক্ষেত্রে শিক্ষককে বরখাস্ত করার ব্যবস্থা করা হয়। এখানেই কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থার কাঠামোগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি শিক্ষা কাঠামোর আওতায় থাকলেও কওমি মাদ্রাসার একটি বড় অংশ পৃথক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। ফলে নিবন্ধন, শিক্ষক নিয়োগ, পরিদর্শন, অভিযোগ তদন্ত, শিশু সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নজরদারির ক্ষেত্রে একক জাতীয় কাঠামো তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গবেষকদের মতে, সমস্যাটিকে শুধু ‘মাদ্রাসার সমস্যা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বড় একটি অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে এবং অভিভাবকের নিয়মিত নজরদারি অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। ফলে ক্ষমতার অসমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, যৌন হয়রানি শুধু মাদ্রাসায় নয়, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ঘটে; তাই সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা মনে করেন, শিশুর যৌন শোষণকে শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা দরকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিশু নির্যাতন একটি বহুমাত্রিক সমস্যা এবং এর সঙ্গে দারিদ্র্য, ক্ষমতার অসমতা, সামাজিক নীরবতা, বিচারহীনতা, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের বিষয় জড়িত। মাদ্রাসার আবাসিক পরিবেশও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে, সেখানে শিক্ষক ও পরিচালকদের ওপর শিশুদের নির্ভরতা বেশি থাকে। এই ক্ষমতার সম্পর্কের অপব্যবহার ঠেকাতে স্বচ্ছ অভিযোগ ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষক যাচাই, শিশু সুরক্ষা নীতি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ অপরিহার্য। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানগত সালিশের মাধ্যমে অপরাধ মীমাংসার চেষ্টা না করে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যৌন নির্যাতনের অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি ফৌজদারি অপরাধ এবং শিশুর মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় গুরুতর শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, ছেলে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনও অপরাধ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনে তা বিচারযোগ্য। কিন্তু আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়; অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, চিকিৎসা সহায়তা, সাক্ষ্য সুরক্ষা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী শিশুর মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন—সবকিছু কার্যকর হতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না? এর পেছনে রয়েছে ভয়, সামাজিক লজ্জা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার চেষ্টা, পরিবারের অসহায়ত্ব, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কখনো ধর্মীয় বা সামাজিক প্রভাবের অপব্যবহার। অভিযোগকারী শিশু যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছেই পড়াশোনা, থাকা বা খাবারের জন্য নির্ভরশীল হয়, তাহলে তার পক্ষে প্রতিবাদ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অভিযোগ জানানোর জন্য এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থী পরিচয় গোপন রেখে নিরাপদে অভিযোগ করতে পারে এবং অভিযোগের পর তার ওপর কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কয়েকটি কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, দেশের সব মাদ্রাসাকে একটি স্বচ্ছ নিবন্ধন ও তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের আগে পরিচয়, যোগ্যতা ও পূর্ববর্তী অপরাধসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিটি মাদ্রাসায় স্বাধীন ও কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ এবং শিশু সুরক্ষা কমিটি থাকা উচিত। চতুর্থত, আবাসিক মাদ্রাসায় নিয়মিত সরকারি বা অনুমোদিত তৃতীয় পক্ষের পরিদর্শন নিশ্চিত করা দরকার। পঞ্চমত, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য শিশু সুরক্ষা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং আইন সম্পর্কে বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। ষষ্ঠত, কোনো অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানগত সালিশের নামে অপরাধ চাপা না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সপ্তমত, সিসিটিভি বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবহার করা হলেও তা যেন শিশুদের গোপনীয়তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই পুরো প্রতিষ্ঠান বা একটি ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা যেমন অনুচিত, তেমনি ‘মাদ্রাসার সুনাম নষ্ট হবে’—এই যুক্তিতে অভিযোগ চাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিরপরাধ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের অযথা কলঙ্কিত না করা—দুই বিষয়ই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন ভিডিও, ছবি বা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়া থেকেও সতর্ক থাকতে হবে, কারণ এতে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় প্রকাশ এবং দ্বিতীয়বার সামাজিক ক্ষতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে অস্বীকার করা যেমন বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করতে পারে, তেমনি নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করাও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ জাতীয় তথ্যব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভেদে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে; প্রয়োজন নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা; প্রয়োজন শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার; আর প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, কলেজ কিংবা অন্য কোনো আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে নীতি হওয়া উচিত একটাই: অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়, ভুক্তভোগীর প্রতি সর্বোচ্চ সুরক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক আইনি ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিতর্ককে আবেগ বা পক্ষপাতের বদলে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সূত্রঃ ডিও নিউজ
মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন: মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ, কর্তৃপক্ষের ভিন্নমত
