ইসলামী ঐতিহ্যে হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ নামে মুসলিম সমাজে পরিচিত একটি স্মরণীয় দিন, যা বহু মুসলমানের কাছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জীবনের শেষ পর্যায়ের অসুস্থতা, তাঁর সুস্থতার প্রত্যাশা এবং নবীপ্রেমের আবেগের সঙ্গে সম্পৃক্ত; ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আলোচনায় এ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেষ অসুস্থতার বিভিন্ন বর্ণনা সামনে আসে, বিশেষ করে উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত সহিহ হাদিসে তাঁর অসুস্থতার শেষ পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়; সহিহ আল-বুখারির ৪৪৪২ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, অসুস্থতা তীব্র হলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের কাছে অনুমতি চান, যাতে তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থান করতে পারেন এবং অনুমতি পাওয়ার পর সেখানে যান; অসুস্থতা যখন আরও তীব্র হয়, তখন তিনি সাতটি মশক থেকে তাঁর ওপর পানি ঢালার নির্দেশ দেন এবং কিছুটা সুস্থতা অনুভব করার পর সাহাবিদের কাছে ফিরে আসেন; এই বর্ণনা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেষ জীবনের অসুস্থতার কঠিন সময়ের পাশাপাশি তাঁর দৃঢ়তা, উম্মতের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে; তবে আখেরি চাহার শোম্বা সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনি ও আমলের ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস, প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্র এবং পরবর্তী লোকাচারের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি, কারণ কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ ধর্মীয় ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করার আগে তার শরিয়তসম্মত প্রমাণ যাচাই করা ইসলামী জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি; রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসুস্থতা প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসে জাদুর ঘটনারও বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে লাবিদ ইবনু আল-আ‘সাম নামের এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর ওপর জাদু করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সেই বিপদ থেকে মুক্তি দেন; সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এ ঘটনার বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে; একই সঙ্গে কুরআনের সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস মুসলমানদের জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও এসব সূরা পাঠ করতেন; তাই জাদু, হিংসা, কুমন্ত্রণা কিংবা অদৃশ্য ক্ষতির আশঙ্কা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও সুন্নাহসম্মত আমল করা মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসুস্থতার সময় সাহাবায়ে কেরামের উদ্বেগ, ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি আনুগত্য ইসলামী ইতিহাসে গভীর তাৎপর্য বহন করে, কারণ তাঁদের কাছে নবী (ﷺ) শুধু একজন নেতা ছিলেন না, বরং আল্লাহর রাসুল এবং ঈমানের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন; তাঁর প্রতি ভালোবাসা তাঁদের ঈমান, আনুগত্য, আত্মত্যাগ ও চরিত্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল; তবে তাঁর অসুস্থতার পর হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উমর (রা.), হজরত উসমান (রা.), হজরত আলি (রা.) ও হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর নির্দিষ্ট পরিমাণ দান-সদকার যে বিবরণ অনেক প্রচলিত লেখায় পাওয়া যায়, সেগুলোর সনদ ও ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং প্রামাণ্য দলিল ছাড়া সেগুলোকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়; এর পরিবর্তে সহিহ সূত্রে প্রতিষ্ঠিত বিষয় হলো—সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, তাঁর নির্দেশ মেনে চলতেন এবং আল্লাহর পথে সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন; তাঁদের জীবন মুসলমানদের জন্য নবীপ্রেমকে কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুন্নাহ, নৈতিকতা, মানবসেবা, দানশীলতা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে বাস্তবায়নের শিক্ষা দেয়; আখেরি চাহার শোম্বাকে ঘিরে মুসলিম সমাজে যে আবেগ ও স্মৃতি গড়ে উঠেছে, তার কেন্দ্রেও তাই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর চরিত্র ধারণ, তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের সঙ্গে সদাচরণ এবং আল্লাহর বিধান মেনে জীবন পরিচালনা করা; ফলে কোনো একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সমগ্র জীবনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা; তাঁর জন্ম, জীবন, সংগ্রাম, মক্কার নির্যাতন, মদিনার রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণ, অসুস্থতা, ইবাদত, পরিবার, প্রতিবেশী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি আচরণ—সবকিছু থেকেই মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; তাঁর শেষ অসুস্থতার স্মৃতি মুসলিম হৃদয়ে বেদনা ও ভালোবাসা জাগিয়ে তুললেও তাঁর শেখানো তাওহিদ, তাকওয়া, ধৈর্য, ক্ষমা, ন্যায়, মানবিকতা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা আজও বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জীবনকে প্রভাবিত করে; তাই আখেরি চাহার শোম্বাকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হতে পারে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায়, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ, তাঁর সহিহ সুন্নাহ অধ্যয়ন, পরিবার ও সমাজে কল্যাণকর কাজ করা এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করা; একই সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বক্তব্য বা প্রচলিত আমলকে গ্রহণের আগে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন, যাতে নবীপ্রেমের আবেগের সঙ্গে ইসলামী জ্ঞানের ভারসাম্য বজায় থাকে; রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবন মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ; তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর শিক্ষা অনুসরণে, তাঁর চরিত্রকে জীবনে ধারণে এবং তাঁর উম্মতের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে; আখেরি চাহার শোম্বাকে ঘিরে মুসলিম সমাজের আবেগ তাই শেষ পর্যন্ত নবীপ্রেম, সুন্নাহ অনুসরণ, আল্লাহর শুকরিয়া এবং আত্মশুদ্ধির দিকে ফিরে যাওয়ার একটি উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা, তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গঠন এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সত্য ও কল্যাণের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন—আমিন।
