সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সাম্প্রতিক হামলার খবর না থাকলেও দেশটির সামরিক অবকাঠামোর ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে অন্তত আটটি ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় আল-ইখবারিয়া টেলিভিশন সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে। হামলায় বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে এটি প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সিরিয়ার সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার ঘটনা নতুন নয়; আসাদ সরকারের পতনের পরও ইসরায়েল সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রভাণ্ডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে আসছে। ইসরায়েলের বক্তব্য, সিরিয়ার ভূখণ্ডে এমন সামরিক সক্ষমতা তৈরি বা সংরক্ষণ ঠেকানোই এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য, যাতে ভবিষ্যতে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে কোনো শত্রুভাবাপন্ন শক্তি। কিন্তু দামেস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও নিজ ভূখণ্ড রক্ষার সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিটি তুরস্কের সীমান্ত থেকে আনুমানিক ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে সামরিক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে সিরিয়ার নতুন সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেওয়া তুরস্কের ভূমিকা ক্রমেই এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে একটি তুর্কি সামরিক প্রতিনিধিদল বিমানঘাঁটিটি পরিদর্শন করেছিল এবং ঘাঁটির পুনর্বাসন ও পুনরায় ব্যবহারের বিষয়ে তুরস্কের আগ্রহ ছিল। ফলে আবু আল-দুহুরে ইসরায়েলি হামলা শুধু সিরিয়ার একটি পুরোনো সামরিক স্থাপনায় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এটি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ সামরিক কাঠামো এবং দেশটিতে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে তৈরি হওয়া কৌশলগত মতপার্থক্যেরও প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আবু আল-দুহুরে হামলার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে তুরস্ক সেখানে রাডার স্থাপনা নির্মাণ করছিল—এমন দাবি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। যা স্পষ্ট, তা হলো আঙ্কারা দামেস্কের নতুন প্রশাসনকে সমর্থন করছে এবং সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ার পুনর্গঠিত সামরিক সক্ষমতাকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়টি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ সিরিয়ার আকাশসীমায় উন্নত রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সিরিয়ার ভেতরে অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। এর পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সিরিয়ার ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা অবকাঠামো পুনর্গঠন, তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির মধ্যে সংঘাত ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে একটি বড় কৌশলগত প্রশ্ন সামনে এসেছে—সিরিয়া যদি নিজের আকাশসীমা রক্ষার জন্য বিমানঘাঁটি, রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে, তাহলে সেই সক্ষমতাগুলোই যদি ইসরায়েলের কাছে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সিরিয়ার জন্য আত্মরক্ষার বৈধ সামরিক সক্ষমতা পুনর্নির্মাণের সুযোগ কোথায়? ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধমূলক’ বা ‘প্রাক-প্রতিহতকারী’ নিরাপত্তা নীতির যুক্তি তুলে ধরে আসছে। কিন্তু ধারাবাহিক হামলার ফলে এমন একটি চক্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যেখানে সিরিয়া সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করবে, ইসরায়েল সেটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখবে এবং পুনর্গঠিত স্থাপনাগুলোতে আবার হামলা চালাবে। রানওয়ে হুমকি হয়ে উঠতে পারে, রাডার হুমকি হতে পারে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এই চক্র দীর্ঘস্থায়ী হলে সিরিয়ার সামরিক দুর্বলতা স্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাও আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতির প্রশ্ন। বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েল গোলান মালভূমি সংলগ্ন জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনে সেনা মোতায়েন ও নতুন অবস্থান গড়ে তোলে, যার মধ্যে মাউন্ট হারমনের মতো কৌশলগত এলাকাও রয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েল শুধু নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; একই সঙ্গে সিরিয়ার ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে সামরিক অবস্থান বজায় রেখে সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোর ওপরও হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তুরস্কের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঙ্কারা সিরিয়ার নতুন সরকারকে সমর্থন করে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিরিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে তুরস্কের সহযোগিতা বাড়লে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ায় কোনো শক্তিশালী সামরিক কাঠামো গড়ে ওঠাকে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। বিশেষ করে তুরস্কের মতো একটি আঞ্চলিক সামরিক শক্তি যদি সিরিয়ার ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সিরিয়ার আকাশসীমা ও সামরিক ভারসাম্যের হিসাব আমূল পরিবর্তিত হতে পারে। এই অবস্থায় আবু আল-দুহুরে হামলা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে নতুন সিরিয়া তার সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল সম্ভাব্য সামরিক হুমকি প্রতিরোধের নামে সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা সীমিত রাখার চেষ্টা করছে এবং তুরস্ক নতুন দামেস্ক প্রশাসনের পাশে দাঁড়িয়ে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে। তিন পক্ষের এই ভিন্ন কৌশল যদি সমন্বয়ের পরিবর্তে মুখোমুখি অবস্থানে পরিণত হয়, তাহলে সিরিয়া আবারও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—বারবার ‘প্রতিরোধমূলক’ হামলা চালানোর নীতি যদি স্থায়ী সামরিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, তাহলে প্রতিটি নতুন অবকাঠামো পুনর্গঠনই পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠবে। এতে সিরিয়ার নিরাপত্তা সংকট যেমন দীর্ঘায়িত হবে, তেমনি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার কৌশলগত উত্তেজনাও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো একটি হামলা যদি সরাসরি তুর্কি সামরিক স্থাপনা, সিরিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা বাহিনী অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তিকে সংঘাতে টেনে নেয়, তাহলে বর্তমান সীমিত আকাশ হামলা বৃহত্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই আবু আল-দুহুরে আটটি বিমান হামলা কেবল একটি রানওয়ে ও সামরিক স্থাপনায় আঘাতের ঘটনা নয়; এটি আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার ভবিষ্যৎ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি, তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সামরিক ভারসাম্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। পরিস্থিতি যদি একই ধারায় এগোয়, তাহলে ‘হামলা—পুনর্গঠন—আবার হামলা’ এই চক্র সিরিয়ার জন্য স্থায়ী অস্থিতিশীলতা এবং পুরো অঞ্চলের জন্য আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
