ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাস ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে এবং হঠাৎ করে বিমান চলাচল বন্ধ, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সীমান্ত পারাপারে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা Level 4, অর্থাৎ “Do Not Travel”।
এই সতর্কবার্তাকে সরাসরি “যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানে হামলা চালাবে” এমন প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে। ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষ নতুন করে বেড়েছে, সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার খবর এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন সম্ভাব্য আঞ্চলিক বিস্তারের আশঙ্কায় নাগরিকদের সতর্ক করছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের উদ্বেগ শুধু ইরানের ভেতরে সম্ভাব্য বিমান হামলা নিয়ে নয়; পুরো পশ্চিম এশিয়ায় একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্ট খুলে যাওয়ার ঝুঁকিও এর মধ্যে রয়েছে।
তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার জন্য তেহরানের শর্ত পাঠানো হয়েছে এবং ইরান এখন ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর প্রকাশ করা প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।
পরবর্তীতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে রেজাইয়ের বক্তব্যের ভিত্তিতে ইরানের সাতটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধ, জব্দ সম্পদ ছাড়, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক শক্তি সরানো, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হুমকি বন্ধ করার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা প্রকাশ্যে যে তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন, সেগুলোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা যাচ্ছে; সাতটি শর্তের পূর্ণ তালিকার সবগুলো একইভাবে স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত হয়নি।
এখানেই বর্তমান সংকটের মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়। ওয়াশিংটন যদি আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করতে চায়, তেহরান বলছে আলোচনার আগে যুদ্ধের পরিবেশ বদলাতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপ বাড়ায়, ইরান সেই চাপের জবাবে নতুন লক্ষ্য ও নতুন অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, নতুন মার্কিন হামলা হলে ইরান তার অস্ত্র ও লক্ষ্য দুটোই পরিবর্তন করবে এবং “যুদ্ধের ভূগোল” বদলে দিতে পারে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে নতুন সামরিক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ফক্স নিউজের ২১ সেপ্টেম্বরের লাইভ আপডেটে বলা হয়, ট্রাম্প “deciding mode”-এ রয়েছেন এবং ইরানকে সতর্ক করে “big things” ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে ওয়াশিংটন নতুন বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই নতুন করে হামলা চালায়, লক্ষ্য কী হতে পারে?
এখানে সামরিক বিশ্লেষণের জায়গাটি অত্যন্ত জটিল। ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর একটি অংশ গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় বিস্তৃত। ফলে বিমান হামলা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতার একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা আর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এক বিষয় নয়। আগের দফার হামলার পরও ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আঞ্চলিক প্রতিশোধমূলক সক্ষমতা ধরে রেখেছে, বর্তমান সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহ তা দেখিয়েছে।
ইরানের অধ্যাপক সাইয়েদ মোহাম্মদ মারান্ডি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান তুলে ধরছেন। গ্লেন ডাইসেনের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক আলোচনাতেও তিনি সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলা হলে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যকে অবশ্য ইরানের সামরিক পরিকল্পনার স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যায় না; এটি একজন ইরানি অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মূল্যায়ন।
অন্যদিকে সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে ইয়েমেনে। সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেও ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজ জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন হুথিদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করা বিমান হামলা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং যুদ্ধবিমান প্রস্তুত হওয়ার পরও হামলা স্থগিত করা হয়, কারণ প্রশাসনের ভেতরে নতুন একটি সামরিক ফ্রন্ট খোলার বিষয়ে আপত্তি ছিল এবং কূটনীতির সুযোগ রাখা হয়েছিল।
রয়টার্সও জানিয়েছে, হুথিরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বাস্তব সামরিক সমস্যা রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সঙ্গে সংঘর্ষে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর কমে আসছে এবং রিয়াদ পশ্চিমা ও আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের কাছে সহায়তা চাইছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে “আমেরিকার অস্ত্র শেষ হয়ে গেছে”। এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বাস্তব চিত্র হলো, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর, নির্ভুল অস্ত্র, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের মজুত এবং উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্নটি এখন কৌশলগত আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের ওপর নতুন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কি সরাসরি ইরানের সামরিক স্থাপনায় আঘাত করবে, নাকি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো জানা নেই। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেছে। আবার যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঘিরেও হুমকি এসেছে। ফলে নতুন হামলা হলে সম্ভাব্য লক্ষ্য নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট তেলক্ষেত্র, গ্যাসক্ষেত্র বা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরবর্তী হামলার নিশ্চিত লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই।
এ ধরনের হামলার ঝুঁকি অবশ্য অত্যন্ত বড়। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হলে শুধু ইরানের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকে ঘিরে ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে। ২১ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলে আক্রান্ত হওয়ার খবরও এসেছে, যা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি কতটা বেড়েছে তা দেখায়।
এখানে “অক্টোবর সারপ্রাইজ” কথাটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে অক্টোবর মাসে ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের উত্তেজনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বিশ্লেষণে তিনি সম্ভাব্য একটি “October Surprise”-এর কথা বলেছেন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের সামরিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আলোচনা করেছেন। তবে এটি একটি বিশ্লেষণ, পূর্বনির্ধারিত ঘটনা নয়।
এখানে সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে যে বিষয়টি দেখতে হবে সেটি হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা। ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করবে বা “আমরা পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছি” ঘোষণা দেবে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই। একইভাবে ট্রাম্প ইসরায়েলকে দিয়ে ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করাবেন, এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এসব সম্ভাবনাকে বর্তমান বাস্তবতা হিসেবে লেখা সাংবাদিকতার দিক থেকে নিরাপদ নয়।
বরং বাস্তব উদ্বেগ হলো, দীর্ঘ সামরিক সংঘাত একটি রাষ্ট্রকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রণোদনা দিতে পারে কি না। এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বিরোধ বহু পুরোনো এবং সামরিক হামলার মাধ্যমে এর সমাধান হবে, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সামরিক চাপের মধ্যে রাখছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, যুদ্ধ বন্ধ, জব্দ সম্পদ ফেরত এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ছাড়া আলোচনায় ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। একই সময়ে ইয়েমেনে হুথি-সৌদি সংঘর্ষ নতুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশ করতে অনিচ্ছুক।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের ইরান ছাড়ার নির্দেশকে তাই দুটি সম্ভাবনার আলোকে দেখা যায়। প্রথমত, ওয়াশিংটন হয়তো সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা ও আকাশপথ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আগেভাগে নাগরিকদের সরিয়ে নিতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সতর্কতা পুরো অঞ্চলে একাধিক সংঘাত একসঙ্গে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে হতে পারে। দুটির কোনটি প্রধান কারণ, তা মার্কিন সরকার প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনীতি, জ্বালানি, সমুদ্রপথ এবং মিত্রদের সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইরান হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরি করতে পারে; হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে চাপ তৈরি করছে; সৌদি আরব নিজের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা চাইছে। এর ফলে সংঘাতটি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। ইরান বা তার মিত্রদের হাতে কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা সৌদি আরব, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা “এক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারবে”। এটি একটি রাজনৈতিক বা সামরিক বিশ্লেষণ হতে পারে, কিন্তু এমন দাবির নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ নেই। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে “ভয় পায়” বলা একটি মূল্যায়ন; এর পরিবর্তে বলা যায়, ওয়াশিংটন ইরানের পাল্টা আঘাত এবং আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি হিসাব করছে।
শেষ পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প প্রশাসন কি নতুন করে সামরিক অভিযান বেছে নেবে, নাকি ইরানের দেওয়া শর্তকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। এই মুহূর্তে দুই পথই খোলা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সতর্কতা, ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য, ইরানের পাল্টা হুমকি এবং কাতার-পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যোগাযোগ একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, সংকটটি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে একটি সামরিক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ভেঙে দিতে পারে।
তাই “ইরানে ভয়ানক হামলা নিশ্চিত” বলা এখনই ঠিক হবে না। কিন্তু “কোনো ঝুঁকি নেই” বলাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রকাশ্য তথ্য বরং দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনকে ঘিরে সংঘাতের একাধিক ফ্রন্ট একই সময়ে সক্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব, ভুল সংকেত বা সীমিত একটি হামলার দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়া।
আগামী কয়েক দিন তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন ইরানের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তেহরান আলোচনার শর্তে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, হুথি-সৌদি সংঘর্ষ কোন দিকে যায় এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের নৌপথ কতটা নিরাপদ থাকে, এসব ঘটনাই পরবর্তী পর্যায়ের সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। আপাতত সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের সতর্ক করছে, ইরান নতুন হামলার ক্ষেত্রে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিচ্ছে এবং একই সময়ে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। এই তিনটি বাস্তবতা একসঙ্গে চলাই বর্তমান ইরান সংকটকে এত অনিশ্চিত করে তুলেছে।
