ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি আরও আক্রমণাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের কথা প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের প্রশ্নে মোজতবা খামেনির অবস্থান তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির তুলনায় আরও কঠোর হতে পারে। যদিও মোজতবা খামেনি কখনো প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে বক্তব্য দেননি, তবু মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, তার নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী ক্ষমতা কাঠামো ভবিষ্যতে ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এই মূল্যায়ন এমন এক সময় সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিরোধিতা করেছিলেন এবং এ বিষয়ে একটি ধর্মীয় ফতোয়াও জারি করেছিলেন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে ইসলামের নীতির পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন নেতৃত্ব সেই নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে পারমাণবিক সক্ষমতাকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। যদিও এ ধরনের মূল্যায়নের পক্ষে কোনো প্রকাশ্য সরকারি ইরানি ঘোষণা নেই, তবু ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা মহলে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু করেনি বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি। তবে তাদের ধারণা, সাম্প্রতিক হামলার পর তেহরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট্রিফিউজ এবং সংবেদনশীল পারমাণবিক সরঞ্জাম মধ্য ইরানের শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ স্থানান্তর করেছে, যা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সুরক্ষিত রাখার কৌশলের অংশ হতে পারে। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-ও ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো নিয়ে অনুরূপ উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছিল।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন, মোজতবা খামেনিকে ঘিরে গোয়েন্দা মূল্যায়নের একটি বড় অংশ যুদ্ধ শুরুর আগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি আহত হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড এবং যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে গেছে। ফলে বর্তমান নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন বলেও কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন। তবুও তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তিনি এখন ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন, যদিও তার বাবার মতো পূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য রয়েছে। তেহরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশ বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইরানের কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখলেও, নতুন নেতৃত্বের অধীনে তেহরানের কৌশল কী হবে, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
পারমাণবিক বোমা তৈরিতে বদ্ধপরিকার সর্বোচ্চ নেতার : দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
