সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের প্রায় দুই বছর পর রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসানের পথে এগিয়েছে দামেস্ক ও মস্কো। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা গোপন ও কূটনৈতিক আলোচনার পর সিরিয়ার নতুন সরকার রাশিয়ার হমেইমিম বিমানঘাঁটি এবং তারতুস নৌঘাঁটি নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় সিরিয়া দুই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বেসামরিক অংশের নিয়ন্ত্রণ নেবে, আর সামরিক অবকাঠামোকে রাশিয়া ও সিরিয়ার যৌথ প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পরিবর্তনকে রুশ সামরিক উপস্থিতি বিলোপ নয়, বরং সিরিয়ার উপকূলে রাশিয়ার উপস্থিতির একটি নতুন কাঠামোয় পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বাশার আল-আসাদ সরকারের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হমেইমিম বিমানঘাঁটি হয়ে ওঠে সিরিয়ায় রুশ বিমান অভিযানের প্রধান কেন্দ্র, আর ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত তারতুস নৌঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকার দিকে রাশিয়ার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা সিরিয়ার যুদ্ধের সময় রাশিয়া ছিল আসাদ সরকারের অন্যতম প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে দামেস্কের পতন ঘটে এবং আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। সেই সময় রুশ বাহিনী আসাদ সরকারকে রক্ষায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। পরবর্তীতে সিরিয়ায় অবস্থানরত রুশ সেনাদের একটি বড় অংশ দেশটি ছেড়ে গেলেও হমেইমিম ও তারতুসে রাশিয়ার উপস্থিতি অব্যাহত থাকে।
নতুন সমঝোতা সেই দীর্ঘস্থায়ী রুশ উপস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে শেষ না করে বরং তার চরিত্র ও কাঠামো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী হমেইমিম বিমানঘাঁটির বেসামরিক স্থাপনা এবং তারতুস বন্দরের বাণিজ্যিক অংশের নিয়ন্ত্রণ সিরিয়ার হাতে যাবে। অন্যদিকে সামরিক অংশগুলো যৌথ রুশ-সিরীয় প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে। ফলে একদিকে দামেস্ক তার ভূখণ্ডের কৌশলগত স্থাপনাগুলোর ওপর অধিকতর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, অন্যদিকে মস্কো সিরিয়ায় তার দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতির একটি অংশ ধরে রাখার সুযোগ পাবে।
সিরিয়ার নতুন সরকারের জন্য এই সমঝোতা কেবল রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, সামরিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিও জড়িত। দীর্ঘ যুদ্ধের পর অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত সিরিয়ার সামনে পুনর্গঠন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। রাশিয়ার সঙ্গে বহু দশকের সামরিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কারণে সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রুশ ও সাবেক সোভিয়েত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা দামেস্কের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সিরীয় নেতৃত্ব বাস্তববাদী কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছে। তারা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। অর্থাৎ দামেস্ক কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। এই নীতির মাধ্যমে সিরিয়া রাশিয়াকে পুরোপুরি দূরে ঠেলে না দিয়ে বরং মস্কোর উপস্থিতিকে অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনায় একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুসলান ট্রাডের মতে, আসাদ সরকারের পতনের পরও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পুরনো শত্রুতা সবসময় ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করে না। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা নতুন সিরীয় নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মস্কোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। এর পেছনে ছিল বাস্তব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। রাশিয়ার হাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আশ্রয়, সিরিয়ার ঋণ ও পুনর্গঠন-সংক্রান্ত স্বার্থ, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার জন্যও সিরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসাদ সরকারের পতন মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা ছিল। কিন্তু হমেইমিম ও তারতুসে উপস্থিতি ধরে রাখতে পারলে রাশিয়া পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং আফ্রিকার দিকে তার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম পাবে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যখন তীব্রভাবে সংঘাতপূর্ণ, তখন মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখা মস্কোর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে।
বিশ্লেষক অ্যালেক্সি মুরাভিয়েভের মতে, রাশিয়া ও সিরিয়া—উভয় পক্ষই একে অপরকে প্রয়োজন বলে মনে করছে। তার ব্যাখ্যায়, দামেস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ করতে আগ্রহী নয় এবং মস্কোও সিরিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত হতে চায় না। ফলে দীর্ঘ দেড় বছরের আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি মধ্যপন্থী সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করেছে। এতে সিরিয়া তার সার্বভৌমত্বের দাবি জোরদার করতে পারছে, আবার রাশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না।
তবে এই সমঝোতা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। আসাদ সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং আঞ্চলিক কিছু শক্তি সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশটি থেকে রাশিয়ার সামরিক প্রভাব কমানোর বিষয়ে আগ্রহী ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু দামেস্ক যদি রাশিয়ার সঙ্গে নতুন কাঠামোয় সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তা সিরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বহুমুখী বা ‘মাল্টি-ভেক্টর’ কৌশলের ইঙ্গিত দেবে।
সিরিয়ার নতুন সরকার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ইউরোপ এবং এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ ও কৌশলগত সম্পর্কের সুযোগ খোলা রাখতে পারে। ফলে দামেস্কের নীতি এখন আর মস্কোকেন্দ্রিক নয়, বরং একাধিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থায় রাশিয়ার উপস্থিতি সিরিয়ার জন্য কেবল অতীতের উত্তরাধিকার নয়; বরং ভবিষ্যৎ দর-কষাকষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তবে নতুন সমঝোতার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো কী ধরনের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, রাশিয়ার সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি কতটা থাকবে এবং ভবিষ্যতে মস্কো নতুন করে বড় সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো পরিষ্কার নয়। একইভাবে সিরিয়ার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেটিও আগামী মাসগুলোতে স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, হমেইমিম ও তারতুস নিয়ে নতুন সমঝোতা সিরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; বরং আসাদ-পরবর্তী যুগে সেই সম্পর্কের পুনর্গঠন। যে রাশিয়া একসময় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আসাদ সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই রাশিয়াই এখন নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আর দামেস্কও অতীতের মিত্রতা ও শত্রুতার হিসাবের বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রয়োজন, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে মস্কোর সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ফলে হমেইমিম ও তারতুসের ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় রাশিয়া ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
