ম্যানিলায় আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের দৃষ্টি ছিল আরও গভীর এক নিরাপত্তা ইস্যুর দিকে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের পরিচালিত একাধিক উচ্চ-নির্ভুল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের পর পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে—তেহরান কি এই হামলাগুলোর পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়ার কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট নজরদারি কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে? যদিও মস্কো এবং তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সহযোগিতার কথা স্বীকার করেনি, তবুও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন এই সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়েই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। পরে সিএনএন মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সম্ভাব্যভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সদস্য, বিমান ও সংবেদনশীল স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে তথ্য সরবরাহ করেছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। সর্বশেষ রয়টার্স জানায়, ইরানের ড্রোন হামলার অসাধারণ নির্ভুলতা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য রুশ সম্পৃক্ততা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানে বাধ্য করেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, তবুও পশ্চিমা নিরাপত্তা মহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কির মতে, ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর লক্ষ্যবস্তুর নির্ভুলতা এবং অপারেশনাল দক্ষতা ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি উন্নতমানের গোয়েন্দা সহায়তা পেয়ে থাকতে পারে। তাঁর ভাষায়, ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট সক্ষমতা সীমিত হলেও রাশিয়ার হাতে রয়েছে শক্তিশালী মহাকাশভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা, উন্নত রিকনাইস্যান্স স্যাটেলাইট এবং ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি। ফলে দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় হয়ে থাকলে তা ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের নিজস্ব মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও অত্যন্ত সক্রিয় এবং লক্ষ্য নির্বাচন ও অপারেশন পরিচালনায় সেই নেটওয়ার্কের ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, তেহরান রাশিয়াকে বিপুল সংখ্যক শাহেদ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোন, ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে, যা ইউক্রেনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির নির্ভুলতা বাড়াতে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা উন্নত করতে এবং নেভিগেশন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করেছে বলে দাবি করা হয়। বিশেষ করে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে রাশিয়ার কোমেতা-এম অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। যদিও মস্কো এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘ভুয়া তথ্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত বছর স্বাক্ষরিত ২০ বছরের বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি সামরিক জোট নয় এবং পারস্পরিক সামরিক হস্তক্ষেপের বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি করে না বলে রাশিয়ার কর্মকর্তারা জানালেও বাস্তবে দুই দেশ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ক্রমবর্ধমানভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক এখন আর কেবল পরিস্থিতিভিত্তিক সহযোগিতা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি গঠনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা একাধিক রাত ধরে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, মিত্র দেশ এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর আন্তর্জাতিক মনোযোগ কিছুটা বিভক্ত হওয়ায় রাশিয়া কৌশলগতভাবে সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক বিশ্লেষক।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতার ভিত্তি মূলত দেশটির নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক। যদি রাশিয়া কোনো সহায়তা দিয়েও থাকে, তবে তা ইরানের বিদ্যমান সক্ষমতাকে আরও নির্ভুল ও কার্যকর করেছে—নতুন কোনো সামরিক শক্তি সৃষ্টি করেনি। ফলে সম্ভাব্য রুশ সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিষেধাজ্ঞা নীতি, ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই গোয়েন্দা সূত্র, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে; রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সেই কারণে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে, আর বিশ্ব এখন নজর রাখছে এই তদন্তের পরবর্তী ফলাফল এবং মস্কো-তেহরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের দিকে।
ইরানের হামলায় রাশিয়ার গোপন ভূমিকা? মার্কিন গোয়েন্দা তদন্তে নতুন বিস্ফোরক অভিযোগ
