মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা নতুন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ইরানের ভেতরে একাধিক গোপন সামরিক হামলা চালিয়েছে, যা ছিল তেহরানের মাটিতে রিয়াদের প্রথম সরাসরি সামরিক আঘাত। পশ্চিমা ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, গত মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমান বাহিনী এসব অভিযান পরিচালনা করে এবং এগুলো ছিল সৌদি ভূখণ্ডে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রতিশোধমূলক জবাব। যদিও হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে এটি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাতে দেখা গেছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও উপসাগরীয় অঞ্চলকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রিয়াদ এখন সরাসরি সামরিক জবাব দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে এই সংঘাতের বিস্তারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইরান শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয়টি দেশের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার তথ্য উঠে আসে। এতে স্পষ্ট হয় যে, সংঘাতের প্রকৃত চিত্র এতদিন অনেকটাই আড়ালে ছিল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও আমিরাতের কৌশলে পার্থক্যও লক্ষ্য করা গেছে। আমিরাত তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইলেও সৌদি আরব একইসঙ্গে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে যায়। রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও জনগণের সমৃদ্ধির স্বার্থে তারা উত্তেজনা হ্রাস ও সংযম বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা সূত্রগুলো বলছে, মার্চের শেষ দিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আরও কঠোর পাল্টা হামলার হুমকির পর সৌদি আরব ও ইরান উত্তেজনা কমাতে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় পৌঁছায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, কিন্তু ১ থেকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। যদিও পরে সৌদি আরব বুঝতে পারে, যুদ্ধবিরতির আগের কিছু হামলা সরাসরি ইরান থেকে নয় বরং ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো হচ্ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে তেহরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছিল। এর জেরে সৌদি আরব ইরাকের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরবে আবারও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, যার পর রিয়াদ ইরান ও ইরাকের বিরুদ্ধে আরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় বিবেচনা করতে শুরু করে। একই সময়ে পাকিস্তান সৌদি আরবকে সমর্থন জানিয়ে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে এবং কূটনৈতিকভাবে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানায়। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত আর শুধু ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোও এখন সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘর্ষের অংশ হয়ে উঠছে। এর ফলে গোটা অঞ্চল নতুন এক অনিশ্চয়তা, সামরিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
