মুমিনের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের গভীরতম অনুভূতিগুলোর একটি। তাঁর জীবন, সুন্নাহ, আদর্শ, দাওয়াত এবং উম্মতের প্রতি তাঁর মমতা মুসলিমদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয়। মদিনা মুনাওয়ারা সেই ভালোবাসার সঙ্গে ইতিহাস, স্মৃতি ও ইবাদতের এক বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছে। এই নগরীতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পর ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন, এখান থেকেই ইসলামের বাণী আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছে যায়। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ও মদিনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আজ মসজিদে নববির অন্তর্ভুক্ত যে পবিত্র স্থানকে রওজা মোবারক বলা হয়, সেটিই সেই কক্ষের স্থান যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শেষ সময় অতিবাহিত করেন এবং যেখানে তাঁকে দাফন করা হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ অসুস্থতার সময় তিনি তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে অবস্থান করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রীগণ তাঁকে অনুমতি দিয়েছিলেন যে তিনি যাঁর ঘরে থাকতে চান সেখানে থাকতে পারবেন। এরপর তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরেই অবস্থান করেন এবং সেখানেই ওফাত নেন। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঘরে, তাঁর পালার দিনে, তাঁর বক্ষ ও গলার মধ্যবর্তী স্থানে মাথা রেখে ওফাত নিয়েছেন । সহিহ বুখারির আরেক বর্ণনায় রয়েছে, তাঁর ওফাতের পর তাঁকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরেই দাফন করা হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের দিন ছিল সোমবার। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। তাঁর ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ৬৩ বছর ছিল—ইসলামী ঐতিহ্যে প্রচলিত ও বহু আলেমের গ্রহণ করা মত অনুযায়ী। ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর ওফাতের বিষয়ে মুসলিম ঐতিহ্যে ১২ রবিউল আউয়াল বহুল প্রচলিত হলেও সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই তাঁর ওফাত তারিখ উল্লেখের ক্ষেত্রে ১২ রবিউল আউয়ালকে একমাত্র সর্বসম্মত তারিখ হিসেবে উপস্থাপন না করাই অধিক সতর্কতার বিষয়। তবে সোমবার ওফাত নিয়েছেন —এটি সহিহ বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাফনের স্থান তাঁর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সেই কক্ষই ছিল। পরবর্তীকালে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকেও সেখানে দাফন করা হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনায় রয়েছে, হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন যেন তাঁকে তাঁর দুই সঙ্গীর পাশে দাফন করা হয় এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সেই অনুমতি দিয়েছিলেন।
বর্তমানে মসজিদে নববির যে অংশ মুসলমানদের কাছে রওজা মোবারক হিসেবে পরিচিত, তা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ও ঐতিহাসিক স্থান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় আগত মুসল্লিরা মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করেন এবং সুযোগ অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করেন। রওজা মোবারককে ঘিরে মুসলিমদের আবেগ ও ভালোবাসা বহু শতাব্দী ধরে ইসলামী সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। তবে রওজা জিয়ারতের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো—সম্মান, আদব, সালাম ও দোয়ার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা এবং একই সঙ্গে ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট রাখা।
মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা কেবল রওজা মোবারকের কারণে নয়; কুরআন-সুন্নাহর আলোচনায় এই নগরীর একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার জন্য বিশেষ বরকতের দোয়া করেছেন। সহিহ মুসলিমে হযরত আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, মদিনায় মক্কার তুলনায় দ্বিগুণ বরকত দান করুন।” সহিহ বুখারিতেও একই অর্থের বর্ণনা রয়েছে।
মদিনার মর্যাদা সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ঈমান মদিনার দিকে ফিরে আসবে, যেমন সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে যায়। এই বর্ণনা মদিনার আধ্যাত্মিক অবস্থান সম্পর্কে ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মদিনার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্ক ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। মক্কায় দীর্ঘ সময় দাওয়াত দেওয়ার পর হিজরতের মাধ্যমে তিনি মদিনায় আগমন করেন। মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের সহযোগিতায় সেখানে একটি নতুন সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মসজিদে নববি শুধু নামাজের স্থান ছিল না; এটি ছিল শিক্ষা, পরামর্শ, সামাজিক নেতৃত্ব, বিচার, দাওয়াত এবং মুসলিম সমাজের নানা কার্যক্রমের কেন্দ্র। এখান থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে ইসলামের বার্তা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
মদিনার প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসার অন্যতম কারণ হলো, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের শেষ দশ বছরের প্রধান কেন্দ্র। এই সময়ের মধ্যে বদর, উহুদ, খন্দকসহ ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। মদিনার মাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদচারণা, সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে একজন মুসলমান যখন মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁর কাছে এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক শহর নয়; বরং নবীপ্রেম, সুন্নাহ ও ইসলামী ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক।
রওজা মোবারক জিয়ারতের প্রসঙ্গে ইসলামী ফিকহে আলেমদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বহু ফকিহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর জিয়ারতকে মুস্তাহাব বা প্রশংসনীয় আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মসজিদে নববি জিয়ারতের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করাকে মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক আমল হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে জিয়ারতের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে দুর্বল বা জাল বর্ণনাকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার না করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে “যে ব্যক্তি হজ করল কিন্তু আমার রওজা জিয়ারত করল না, সে আমার প্রতি জুলুম করল”—এই বক্তব্যটি নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিস হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; হাদিসটির সনদ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের কঠোর সমালোচনা রয়েছে এবং কিছু গবেষক এটিকে জাল বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই ওয়েবসাইটের ধর্মীয় প্রতিবেদনে এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিশ্চিত বাণী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
একইভাবে “যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করল”—এ ধরনের বর্ণনা বিভিন্ন কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে এবং রওজা জিয়ারতের ফজিলত আলোচনায় তা বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর সনদ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ফলে ধর্মীয় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ ধরনের বর্ণনা উল্লেখ করলে তার হাদিসের মান সম্পর্কে সতর্কতা রাখা প্রয়োজন। এতে পাঠক সহিহ, হাসান, দুর্বল বা বিতর্কিত বর্ণনার পার্থক্য বুঝতে পারেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে অনির্ভরযোগ্য কথা প্রচারের ঝুঁকি কমে।
রওজা মোবারক জিয়ারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আদব। একজন মুসলমান মসজিদে নববিতে প্রবেশ করলে আল্লাহর ইবাদত করেন, নামাজ আদায় করেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি শান্তি ও সালাম পেশ করেন। কবরের সামনে অবস্থানের সময় কণ্ঠস্বর নিচু রাখা, অশোভন আচরণ থেকে বিরত থাকা এবং অন্য মুসল্লিদের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটানো ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ। রওজা মোবারকের সামনে নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য কোনো স্বাধীন ক্ষমতা কারও আছে—এমন বিশ্বাস ইসলামের তাওহিদের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মুসলমানরা দোয়া করবেন একমাত্র আল্লাহর কাছে; আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সালাম ও সম্মান প্রকাশ করবেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ শুধু রওজা জিয়ারত নয়; তাঁর সুন্নাহ অনুসরণও সেই ভালোবাসার অপরিহার্য অংশ। একজন মানুষ মদিনায় গিয়ে রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়ালেন, কিন্তু ফিরে এসে যদি তাঁর চরিত্র, নামাজ, আমল, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং নৈতিক জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই সফরের আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য পূর্ণতা পায় না। নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো তাঁর আনুগত্য, তাঁর আদর্শ অনুসরণ এবং তাঁর শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
মদিনার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মসজিদে নববির ফজিলত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি মসজিদের বিশেষ মর্যাদা উল্লেখ করেছেন—মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববি এবং মসজিদুল আকসা। তাই মদিনা সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করা এবং সেখানে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। রওজা মোবারকের জিয়ারত সেই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অংশ হলেও মূল ইবাদত ও দোয়া আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।
রওজা মোবারকের বর্তমান অবস্থানও ইসলামী ইতিহাসের দীর্ঘ ধারার সাক্ষী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাফনের সময় এটি ছিল আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরের অংশ। পরবর্তী যুগে মসজিদে নববির সম্প্রসারণের ফলে সেই কক্ষ মসজিদ এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আজকের মসজিদে নববি বহুবার সম্প্রসারিত ও সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু মূল ঐতিহাসিক স্থানটি মুসলিমদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ বিশ্রামস্থল হিসেবে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবরও একই ঐতিহাসিক কক্ষে অবস্থিত। তাঁদের দুজনের জীবন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং ইসলামের প্রথম খলিফা। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁদের কবর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরের পাশে থাকার বিষয়টি মুসলিম ঐতিহ্যে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
তবে রওজা মোবারকের পাশে একটি “খালি কবর” রয়েছে এবং সেখানে ভবিষ্যতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দাফন করা হবে—এ বক্তব্যকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এ বিষয়ে মুসলিম সমাজে কিছু প্রচলিত বর্ণনা ও মতামত থাকলেও নির্ভরযোগ্য সহিহ সূত্রে রওজা মোবারকের পাশে একটি নির্দিষ্ট খালি কবর ভবিষ্যতে ঈসা আলাইহিস সালামের দাফনের জন্য নির্ধারিত—এমন তথ্য প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই দায়িত্বশীল ধর্মীয় সাংবাদিকতায় এ বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ না করাই যথাযথ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মোবারক জিয়ারতের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে আসে তা হলো নবীপ্রেম। একজন মুসলমান যখন মদিনার পথে যাত্রা করেন, তখন তাঁর হৃদয়ে থাকে সেই নগরীর প্রতি গভীর আকর্ষণ যেখানে তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসবাস করেছেন, সাহাবাদের সঙ্গে ইসলামের সমাজ গড়ে তুলেছেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। রওজা মোবারকের সামনে সালাম পেশ করার মুহূর্তটি বহু মুসলমানের কাছে জীবনের অন্যতম আবেগঘন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই আবেগ যেন শরিয়তের আদব ও তাওহিদের সীমা অতিক্রম না করে—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মদিনা তাই শুধু একটি শহরের নাম নয়। এটি হিজরতের স্মৃতি, নবীজির সুন্নাহ, সাহাবাদের ত্যাগ, ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রীয় সমাজব্যবস্থা, মসজিদে নববির ইতিহাস এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ জীবনের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। সহিহ হাদিসে মদিনার বরকত এবং ঈমানের সঙ্গে এই নগরীর বিশেষ সম্পর্কের কথা এসেছে।
রওজা মোবারক জিয়ারতের মূল শিক্ষা তাই শুধু একটি স্থান দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকে স্মরণ করা, তাঁর প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠ করা, তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা এবং নিজের জীবনে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। মদিনা সফর একজন মুমিনকে মনে করিয়ে দিতে পারে—ইসলামের ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; বরং সেই ইতিহাসের শিক্ষা বর্তমান জীবনেও অনুসরণযোগ্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই ভালোবাসা মানুষের চরিত্র, ইবাদত, ন্যায়বোধ, দয়া, সত্যবাদিতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে প্রকাশ পায়।
এই কারণেই মদিনা মুনাওয়ারা মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মসজিদে নববি ও রওজা মোবারককে ঘিরে কোটি কোটি মুসলমানের আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরও তাঁর শিক্ষা, সুন্নাহ এবং আদর্শ বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। আর মদিনায় তাঁর রওজা মোবারক সেই মহান ইতিহাসের এক গভীর স্মারক, যেখানে একজন মুমিন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিনয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে নিজের ঈমান ও আমলকে নতুন করে পর্যালোচনা করার সুযোগ পান।
অতএব, রওজা মোবারক জিয়ারতকে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে দেখা উচিত, তবে একই সঙ্গে সহিহ সুন্নাহ, তাওহিদ এবং ইসলামী আদবের সীমারেখা মেনে চলাও জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠানো, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, মদিনার পবিত্রতার প্রতি সম্মান দেখানো এবং আল্লাহর কাছে নিজের ও সমগ্র উম্মতের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করা—এসবই একজন মুসলমানের জন্য নবীপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ। মদিনার প্রতি ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই ভালোবাসা মানুষকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো সত্য, ন্যায়, দয়া ও আল্লাহভীতির পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
