গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১২ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে একটি মসজিদ ও বাস্তুচ্যুত শত শত ফিলিস্তিনির আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত তাঁবু ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। মঙ্গলবার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান গাজার কেন্দ্রীয় ও উত্তরাঞ্চলে একাধিক বিমান হামলা চালায়। এর মধ্যে গাজা সিটির ইয়ং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াইএমসিএ) ভবনের কাছে অবস্থিত আল-মুত্তাকিন মসজিদ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যাতে মসজিদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আশপাশের এলাকায় থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়স্থলগুলোও ধ্বংস হয়ে যায়।
আল-জাজিরার প্রতিনিধি তারেক আবু আজ্জুম দেইর আল-বালাহ থেকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো গাজার মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, হামলার আগে কিছু এলাকায় সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য খুব অল্প সময় দেওয়া হয়েছিল। ফলে অনেক বেসামরিক মানুষ হামলার ঝুঁকির মধ্যে আটকা পড়ে যান।
গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরেও পৃথক এক হামলায় একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি ব্যস্ত বাজার এলাকায় জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নতুন করে আরও হামলার আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছেন।
গাজায় চলমান এই হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। রোববার ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা এমন একটি পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কাঠামোর অংশ হিসেবে গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রথম সদস্যদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সময়ে চলমান সামরিক অভিযান ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও উত্তেজনা বেড়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, বেথলেহেমের কাছে আবু নাজিম এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় একটি বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর আটজন ফিলিস্তিনি তাদের ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা একটি গাড়িতে আগুন দেয় এবং ভবনের দেয়ালে বিভিন্ন লেখা স্প্রে করার পর বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ করে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ি, কৃষিজমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
একই সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল নিয়েও নতুন অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জেনিন গভর্নরেটের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০০ ডুনাম (প্রায় ২০ হেক্টর বা ৪৯ একর) জমি দখলের সামরিক আদেশ জারি করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, গত কয়েক দিনে বিশেষ করে আরাব্বেহ, কাবাতিয়া ও মিসিলিয়া এলাকায় ভূমি দখলের আদেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেছেন, এসব জমির একটি অংশ সামরিক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পশ্চিম তীরে নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। ইসরায়েল এর আগে জানিয়েছে, তাদের সামরিক পদক্ষেপগুলো মূলত নিরাপত্তার প্রয়োজনেই নেওয়া হয়।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সমালোচনা করে এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে আসছে।
গাজা ও পশ্চিম তীরে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি রয়েছেন। বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসযজ্ঞ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংঘাতের চক্র আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গাজায় পাশ্চিম তীরে মসজিদ ও শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ব্যাপক বোমা হামলা।
