ওয়াশিংটন, ৭ আগস্ট ২০২৬: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা শুক্রবার রয়টার্সকে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অগ্রগতি হচ্ছে এবং শিগগিরই একটি চুক্তি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই পুনরায় চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই বক্তব্যকে কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ৬ আগস্ট ওমানের মুসান্দাম এলাকা থেকে হরমুজ প্রণালির কাছে একাধিক জাহাজ চলাচলের দৃশ্য দেখা যায়, যখন গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্নে পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন আশা করছে, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি চুক্তি ঘোষণা করা সম্ভব হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে, শুধু কোনো সমঝোতা ঘোষণাই যথেষ্ট হবে না; ইরানকে চুক্তিতে করা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে ইরানের বাস্তব কর্মকাণ্ডের ওপর।
মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই পুনরায় চালু করার বিষয়ে চুক্তি ঘোষণা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে। এর মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধকে একই কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ হবে ‘কার্যসম্পাদনভিত্তিক’—অর্থাৎ ইরান তার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করছে, তার ওপর নির্ভর করবে মার্কিন অবস্থানের পরিবর্তন।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটপথ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, নৌপরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই কারণেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য চুক্তিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা কিছুটা কমতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথে নিয়মিত কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কমানোর ক্ষেত্রেও একটি চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় ওমানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক উত্তেজনার সময় ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় মাসকাট দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। এবারও হরমুজ প্রণালির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ওমান একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতু হিসেবে সামনে এসেছে। ইরান-ওমান আলোচনায় অগ্রগতির খবর তাই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক তৎপরতার নতুন একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে সম্ভাব্য চুক্তিকে ঘিরে এখনো সতর্কতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে তার সব পদক্ষেপ পরিবর্তন করতে যাচ্ছে না। বরং ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে মার্কিন পদক্ষেপ পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে চুক্তি ঘোষণা হলেও সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত ও কতটা স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হয়, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হলে এটি বৃহত্তর ইরান-মার্কিন উত্তেজনা কমানোর পথও খুলে দিতে পারে। কারণ সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ধাপে ধাপে উত্তেজনা প্রশমন প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে উভয় পক্ষকেই কঠিন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেই বাস্তবায়নের স্বীকৃতি—দুই ক্ষেত্রেই আস্থার সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সম্ভাব্য চুক্তির ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে এর বাস্তব প্রয়োগ।
এ মুহূর্তে ওয়াশিংটনের বার্তা সতর্ক আশাবাদী। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং শিগগিরই একটি চুক্তির প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে, ইরান তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পালন করছে, তার ওপরই মার্কিন পদক্ষেপ নির্ভর করবে। যদি আলোচনার এই অগ্রগতি একটি কার্যকর ও স্থায়ী সমঝোতায় রূপ নেয় এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্নে পুনরুদ্ধার হয়, তাহলে এটি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটের অবসানের সূচনা নয়, বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রেও একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তির পথে ইরান-ওমান, হরমুজ খুললে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
