ন্যাটোর দৃঢ়তা পরীক্ষা করতে সীমিত হামলা চালাতে পারেন পুতিন, সতর্কবার্তা মার্কিন গোয়েন্দাদের — সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সীমিত পরিসরের সামরিক বা অন্য কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়ে পশ্চিমা সামরিক জোটের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করতে পারেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য রুশ পদক্ষেপ সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান দিয়ে শুরু নাও হতে পারে; বরং সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নাশকতা, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সীমিত আঘাত, সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক সামরিক তৎপরতা কিংবা ছোট আকারের স্থল অনুপ্রবেশের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে মস্কো ন্যাটোর প্রতিক্রিয়ার সীমা যাচাই করতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা মহলের এই মূল্যায়ন কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয় এবং রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন দাবিও করা হচ্ছে না; বরং ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ, রাশিয়ার সামরিক পুনর্গঠন এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিবর্তনের আলোকে একটি ভবিষ্যৎ ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় যা ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সীমার নিচে রাখা হয়, তাহলে ন্যাটোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ জোটের সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা হলে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর অধীনে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রশ্ন সামনে আসে, কিন্তু সাইবার হামলা, নাশকতা, সীমিত অনুপ্রবেশ বা তথাকথিত ধূসর অঞ্চলের আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ার ধরন নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। এই সম্ভাব্য দুর্বলতাই রাশিয়া কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে বলে পশ্চিমা নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইতোমধ্যে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে এবং ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্যদেশগুলো রুশ সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে। একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রুশ গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার হামলা, নাশকতা ও ড্রোন-সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনার প্রত্যেকটির সঙ্গে সরাসরি রুশ সরকারের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত নয়, তবে পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে হাইব্রিড কৌশল ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করার চেষ্টা করছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে সম্ভাব্য রুশ সামরিক পদক্ষেপের সময়সীমা হিসেবে আগামী কয়েক বছরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল এবং যুদ্ধ শেষে রাশিয়া কত দ্রুত তার সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন করতে পারে, তা এই ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে রাশিয়া যদি সামরিকভাবে অভিজ্ঞ ও পুনর্গঠিত বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসে এবং একই সময়ে ন্যাটোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে মস্কোর সামনে সীমিত আকারে ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে অন্যদিকে ন্যাটোও গত কয়েক বছরে পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন, বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে রাশিয়াকে প্রতিরোধ করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে রাশিয়ার জন্য ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে সীমিত হামলাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে, কারণ একটি ছোট সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বিষয়টি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনকে দীর্ঘদিনের সামরিক সহায়তা, ইউরোপে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতির কারণে ওয়াশিংটনের অস্ত্র ও সামরিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে রাশিয়া যদি ন্যাটোর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সীমিত আক্রমণ চালিয়ে জোটের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করে, তাহলে ওয়াশিংটনের সামনে একাধিক কৌশলগত অগ্রাধিকার সামলানোর কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক ঐক্যের। রাশিয়া যদি এমন একটি পদক্ষেপ নেয় যা সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও একটি সদস্যদেশের নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলে, তখন জোটের ৩২টি সদস্যদেশ কত দ্রুত এবং কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে মূল প্রশ্ন। মস্কোর সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে ন্যাটোর সদস্যদের সামনে দুটি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প থাকবে—কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংঘাত বাড়ানোর ঝুঁকি নেওয়া অথবা সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ভবিষ্যতে আরও রুশ পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি করা। এই কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সতর্কবার্তাকে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দা মূল্যায়ন মানেই ভবিষ্যৎ ঘটনা নিশ্চিতভাবে ঘটবে—এমন নয়; বরং সম্ভাব্য হুমকি আগে থেকেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ ধরনের মূল্যায়ন তৈরি করা হয়। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ও ন্যাটোর সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি, রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা, ইউরোপের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর। কিন্তু একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশ আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, আর রাশিয়া যদি সত্যিই ন্যাটোর প্রতিক্রিয়ার সীমা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে একটি সীমিত সংঘাতও গোটা ইউরোপের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের সূচনা করতে পারে।
