মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরাক আগামী ছয় বছরের মধ্যে নিজেদের দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি শুক্রবার বাগদাদে অনুষ্ঠিত একটি নীতিবিষয়ক সম্মেলনে জানান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের নতুন পথ তৈরি করাও বাগদাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে ইরাক সৌদি আরবের কাছে পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থার নির্ধারিত উৎপাদন কোটা বাড়ানোর দাবি জানাতে তেল ও অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। সৌদি আরব সংস্থাটির কার্যত প্রভাবশালী নেতৃত্বে থাকায় বাগদাদের এই উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ তেল উৎপাদন কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত; কিন্তু ইরান যুদ্ধের বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অবরোধসদৃশ পরিস্থিতির কারণে দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোটের নতুন উৎপাদন ভিত্তি নির্ধারণের প্রক্রিয়াও বাগদাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জোটের সদস্য দেশগুলোর সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই করতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিগোলিয়ার অ্যান্ড ম্যাকনটনকে স্বাধীন মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তাদের প্রতিবেদন পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থার সচিবালয়ে জমা পড়ার কথা। এরপর ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হতে পারে এমন নতুন উৎপাদন ভিত্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। সাধারণত এসব আলোচনায় বেশি উৎপাদন সক্ষমতার দাবি করা দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ উচ্চতর উৎপাদন ভিত্তি ভবিষ্যতে তুলনামূলক বেশি উৎপাদন অনুমোদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইরাকের পরিকল্পনা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে দেশটি তেল রপ্তানির বিকল্প অবকাঠামোও দ্রুত সম্প্রসারণ করতে চাইছে। বাগদাদ তুরস্কের জেইহান বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর এবং জর্ডানের আকাবা বন্দর ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে ইরাক থেকে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পাঠানোর পরিকল্পনাকে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সরবরাহ বিঘ্নের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় চার বছর সময় লাগতে পারে এবং ব্যয় হতে পারে অন্তত ১৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ইরাকের একমাত্র কার্যকর তেল রপ্তানি পাইপলাইন তুরস্কের জেইহান বন্দরের সঙ্গে যুক্ত, যার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। ইরাকের এই নতুন কৌশল এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে রয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এপ্রিল ও জুনে দুটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসেনি এবং ওই অঞ্চলে জাহাজগুলো হামলার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ফলে ইরাকের উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা শুধু দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত জ্বালানি ভূরাজনীতিতে বাগদাদের কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের একটি বড় প্রচেষ্টা। যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয় এবং একই সঙ্গে তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্ডানের মাধ্যমে বিকল্প রপ্তানি করিডোর কার্যকর করা যায়, তাহলে ইরাক বৈশ্বিক তেল বাজারে আরও বড় সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এবং হরমুজকেন্দ্রিক সরবরাহ ঝুঁকির প্রভাবও আংশিকভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। তবে এত বড় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন কোটা নিয়ে সমঝোতা—সবকিছুকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেখানেই ইরাকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধপরবর্তী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা।
