সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নেপথ্যে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের নতুন বিবরণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন এবং সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে সৌদি আরবের আলউলায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সৌদি সরকারি নথি অনুযায়ী, বৈঠকে গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রভাবশালী সাময়িকীর বিস্তৃত প্রতিবেদনে ওই বৈঠকের কিছু অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও সৌদি যুবরাজের ব্যক্তিগত উদ্বেগ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর দাবি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্লিংকেনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগিয়ে নেওয়া—যে উদ্যোগ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনটির বর্ণনা অনুযায়ী, মোহাম্মদ বিন সালমান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে নীতিগতভাবে আগ্রহ দেখালেও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সৌদি জনমতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্লিংকেন জানতে চান, ভবিষ্যতে যদি ইসরায়েল গাজায় আবার সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে সৌদি আরব কীভাবে বিষয়টি দেখবে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিন সালমান এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে কোনো চুক্তির পর দীর্ঘ সময়—সম্ভবত ছয় মাস বা এক বছর—পর ইসরায়েল কোনো অভিযান চালালে সেটি তুলনামূলকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে; কিন্তু চুক্তির পরপরই এমন পদক্ষেপ হলে তা সৌদি সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে।
এই আলোচনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল সৌদি সমাজের পরিবর্তিত মনোভাব নিয়ে বিন সালমানের উদ্বেগ। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ব্লিংকেনকে জানান, সৌদি আরবের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ তার চেয়ে বয়সে ছোট। ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে তাদের বড় একটি অংশ ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আগের প্রজন্মের মতো গভীরভাবে অনুভব করত না; কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন সৌদি জনগণের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
বিন সালমানের কথিত বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য। সাময়িকীটির বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে কতটা গুরুত্ব দেন এবং সৌদি জনগণের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব কতটা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যের কথা তুলে ধরেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে ব্লিংকেন নিজেও প্রকাশ্যে বলেন যে, মোহাম্মদ বিন সালমান তাকে সৌদি জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ তার চেয়ে কম বয়সী এবং গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের মনোযোগ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ব্লিংকেন আরও বলেন, সৌদি আরবের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ এখন আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আলোচনায় বিন সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশঙ্কার কথাও উঠে আসে বলে সাময়িকীটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সৌদি যুবরাজ নাকি তার উপদেষ্টাদের একটি অংশের সতর্কতার কথা উল্লেখ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিক কোনো চুক্তিতে এগিয়ে গেলে তার পরিণতি মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের মতো হতে পারে। সাদাত ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি ও ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তির পর ১৯৮১ সালে আততায়ীদের হাতে নিহত হন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। সৌদি এক কর্মকর্তা ওই প্রতিবেদনে মোহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যের কিছু বিবরণকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অর্থাৎ প্রতিবেদনে প্রকাশিত প্রতিটি উদ্ধৃতি সৌদি সরকারের স্বীকৃত বক্তব্য নয়। একই সময়ে, ব্লিংকেন নিজেই পরবর্তী সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন যে তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন এবং সৌদি জনসংখ্যার তরুণ বয়সী কাঠামো ও গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন প্রশ্নে জনমতের পরিবর্তন নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।
সরকারি নথিও অন্তত বৈঠকটির অস্তিত্ব এবং আলোচনার বিস্তৃত বিষয়বস্তু নিশ্চিত করে। ৮ জানুয়ারি ২০২৪ আলউলায় অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে সৌদি সরকারি সংবাদমাধ্যম জানায়, দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে। গাজা ও এর আশপাশের পরিস্থিতি ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। বিন সালমান সামরিক অভিযান বন্ধ করা, মানবিক সহায়তা বাড়ানো এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার নিশ্চিত করে একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরির ওপর জোর দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ছিল বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্লিংকেন পরবর্তীতে বলেন, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য গাজায় সংঘাতের অবসান এবং একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দিকে বিশ্বাসযোগ্য পথ—দুটি বিষয়ই অপরিহার্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের পর সৌদি আরবের কাছে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই বাস্তবতা সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে একটি জটিল কূটনৈতিক সমীকরণে পরিণত করে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আঞ্চলিক একীভূতকরণকে আরও এগিয়ে নিতে পারত এবং যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা চুক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বৃহত্তর সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারত। ব্লিংকেন পরবর্তীতে বলেন, এই বৃহত্তর সমঝোতার অনেক উপাদান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
কিন্তু রিয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা ছিল গাজা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্ন। সৌদি নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করেছে যে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ অত্যন্ত কঠিন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জানায়, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রশ্নে তারা এগোবে না।
ফলে জানুয়ারি ২০২৪-এর ব্লিংকেন-বিন সালমান বৈঠনের কথিত আলোচনা শুধু সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনাই তুলে ধরে না; বরং এটি দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই ঐতিহাসিক সমীকরণে কূটনৈতিক চুক্তির পাশাপাশি জনমত, গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং সৌদি নেতৃত্বের নিজস্ব রাজনৈতিক নিরাপত্তা—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
শেষ পর্যন্ত সৌদি-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ জনমতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। আর সেই কারণেই ব্লিংকেন ও মোহাম্মদ বিন সালমানের ওই বৈঠক আজও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
