ট্রাম্পের নৌ-অবরোধেও কাবু হবে না ইরান, আরও কয়েক মাস টিকে থাকার সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইএ’র গোপন রিপোর্ট। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ার আগেও ইরান অন্তত আরও তিন থেকে চার মাস মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করতে পারবে। এ তথ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশাবাদ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টানা বোমাবর্ষণের পরও তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন এক কর্মকর্তার দাবি, ইরানের হাতে এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ভূগর্ভস্থ অনেক স্টোরেজ পুনরায় সচল করা হয়েছে এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের কাজও অব্যাহত রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ওভাল অফিসে দাবি করেছিলেন, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের সামরিক শক্তি অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এখনো তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, মজুদ হস্তান্তর কিংবা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো ওয়াশিংটনের মূল দাবিগুলো মানেনি। ট্রাম্প নৌ-অবরোধকে “ইস্পাতের দেয়াল” হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি ভেদ করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। অপরদিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দাবি করছে, ইরানের প্রধান তেল টার্মিনালগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাবে এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন আরও বেশি কঠোর ও দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তাদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যের চেয়েও দীর্ঘ সময় তারা টিকে থাকতে পারবে। এদিকে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে, ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর শতাধিক অবকাঠামো ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। হোয়াইট হাউসের দাবি, অবরোধের ফলে ইরান প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে শ্বাসরোধ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিআইএ’র মূল্যায়ন বলছে, তেহরান ৯০ থেকে ১২০ দিন বা তারও বেশি সময় এই চাপ সহ্য করতে সক্ষম হতে পারে। অবিক্রিত তেল ভাসমান ট্যাঙ্কারে সংরক্ষণ, উৎপাদন কমিয়ে তেলক্ষেত্র সচল রাখা এবং মধ্য এশিয়ার রেলপথ ব্যবহার করে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির চেষ্টাও চালাচ্ছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বিস্তারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কম খরচের ড্রোনই বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ ছোট ছোট গুদামেও এসব ড্রোন তৈরি ও লুকিয়ে রাখা সহজ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজের মতে, কোনো একটি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলাই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বীমা ব্যবস্থায় বড় সংকট তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ অবরোধ চালিয়েও ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা নাও যেতে পারে। বরং এই যুদ্ধের ফল উল্টো কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে, যেখানে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে এবং নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখবে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিরুদ্ধে পূর্ণ নৌ-অবরোধ আরোপ করে। বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ সম্ভাব্য শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে।
