নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান, উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ, কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি এবং আসন্ন শীতকে সামনে রেখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকের পর জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয়ই শীত আসার আগেই যুদ্ধের অবসান দেখতে চায় এবং দুই পক্ষ এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছে, যা উত্তেজনা কমিয়ে কূটনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকটি ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ছিল। তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের দলগুলো ইউক্রেনের মাটিতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন চালুর বিষয়ে কাজ অব্যাহত রাখছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, নিজ দেশে এসব প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে উঠলে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই বৈঠকে আসন্ন শীতের জন্য ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইউক্রেনের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা বর্তমানে যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাশিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় উন্নত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরে তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়ে আসছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সিনেটরের সঙ্গেও জেলেনস্কির বৈঠকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা এবং আসন্ন শীতের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা এর আগেও আলোচনায় এসেছে। জুলাই মাসে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র যৌথভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং রেথিয়ন ইউক্রেনের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দলগুলো প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ইউক্রেনে চালুর বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়া যদি আলোচনায় আগ্রহ না দেখায় এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে এই সক্ষমতা ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবে কখন এবং কী পরিমাণে শুরু হবে, সে বিষয়ে বৈঠকের পর কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদন সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলতে পারে। দুই পক্ষই শীতের আগেই যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্য প্রকাশ করেছে। তবে এই বক্তব্যকে যুদ্ধের অবসানের চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটি আলোচনার সম্ভাব্য পথ ও উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপ নিয়ে দুই নেতার আলোচনার বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের আকাশপথে হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকার খবর এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের হামলা যুদ্ধের পাশাপাশি জ্বালানি ও অবকাঠামো নিরাপত্তাকেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেছে।
আসন্ন শীত নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগের একটি বড় কারণ দেশটির জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। শীতের সময় বিদ্যুৎ, তাপ ও অন্যান্য মৌলিক সেবা সচল রাখা ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষার বিষয়টিও কিয়েভের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় একদল সিনেটরের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, সেখানে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার, ইউক্রেনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং আসন্ন শীতের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জেলেনস্কি বিশেষভাবে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ও প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর চাপের বিষয়টি সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও স্পষ্ট হয়েছে। রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার পিএসি-৩ এমএসই প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরস ডিফেন্সও যুক্ত হয়েছে। লকহিড মার্টিন প্যাট্রিয়ট উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ করছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের মাটিতে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এ ধরনের উৎপাদনের জন্য প্রযুক্তি, অনুমোদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার মতো একাধিক বিষয় সমন্বয় করতে হবে। তাই পরিকল্পনাটি বাস্তবে কত দ্রুত উৎপাদনে রূপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের বৈঠকে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নয়, অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের জন্য শীতকালীন আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা অন্যতম। জেলেনস্কি বৈঠকের পর ট্রাম্প, তার দল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ইউক্রেন নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, দ্রুতগতির হামলাকারী ড্রোন মোকাবিলায় নতুন প্রতিরোধী ব্যবস্থা উৎপাদনের গতি বাড়ানোর বিষয়ে ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্ব ও শিল্পখাতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কম ব্যয়ের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির আলোচনার গুরুত্ব এখানেই যে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এখন যুদ্ধের অবসান এবং উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য পথ নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এই বৈঠক থেকে আসেনি। ফলে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা এগোয়, সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে। একদিকে কিয়েভ যুদ্ধের অবসানের জন্য কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য নতুন রুশ হামলা মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের স্থানীয় উৎপাদন এবং শীতকালীন আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এই দ্বিমুখী কৌশলেরই অংশ।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির নিউইয়র্ক বৈঠকের পর এখন নজর থাকবে উত্তেজনা কমানোর প্রস্তাবগুলো বাস্তবে কোনো আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে কি না এবং ইউক্রেনের জন্য শীতকালীন প্রতিরক্ষা সহায়তা কতটা দ্রুত এগোয় তার ওপর। একই সঙ্গে ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়, সেটিও দেশটির ভবিষ্যৎ আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
