বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে আন্তর্জাতিক কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তুরস্কের প্রদর্শিত ‘ইলদিরিম’ নামের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক এক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রদর্শনীতে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান রোকেটসান যে বিশালাকৃতির ক্ষেপণাস্ত্র মডেল উপস্থাপন করেছে, তা আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক, কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রদর্শিত আই সি বি এম ক্ষেপণাস্ত্রটির গায়ে স্পষ্টভাবে “আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র” পরিচিতি উল্লেখ থাকায় এটিকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ কৌশলগত শক্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং বর্তমানে বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি রাষ্ট্রের কাছেই এই সক্ষমতা রয়েছে। ফলে তুরস্কের এমন প্রদর্শন আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্য এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে তুরস্ক ধারাবাহিকভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করেছে এবং মানববিহীন যুদ্ধযান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, যুদ্ধজাহাজ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান নেতৃত্বে দেশটি বিদেশি অস্ত্রনির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার কৌশল বাস্তবায়ন করছে, যা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন গুরুত্ব সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইলদিরিম’ ক্ষেপণাস্ত্রের এই প্রদর্শনের মাধ্যমে আঙ্কারা শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও দিতে চেয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সামরিক তথ্যভাণ্ডারগুলোতে এখনো তুরস্কের পূর্ণাঙ্গ কার্যকর আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ হয়নি, তবুও অনেক পর্যবেক্ষক এটিকে উন্নয়নাধীন প্রকল্প, ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা অথবা কৌশলগত সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সামরিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তুরস্কের এই অগ্রগতি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের কৌশলগত বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভবিষ্যতে তুরস্ক বাস্তবিক অর্থে এই ধরনের দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে সফলতা অর্জন করে, তাহলে তা শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সামরিক কৌশলেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
