ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছর পেরিয়ে আরও ভয়াবহ ও অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করার মধ্যে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো চরম পদক্ষেপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, পাল্টা রুশ হামলা এবং সম্ভাব্য নতুন সেনা সমাবেশের খবরের মধ্যে তার এই মন্তব্য যুদ্ধের বিস্তৃত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ফিদান রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সম্মুখযুদ্ধ যখন ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতে পরিণত হয়, তখন বিষয়টি শুধু সামরিক জয়-পরাজামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষ নিজের হাতে থাকা ‘শেষ সুযোগ’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদিও ফিদান সরাসরি বলেননি যে রাশিয়া পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বক্তব্যে মস্কো এমন চরম পদক্ষেপের দিকে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে বর্ণনা করে জানান, সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাশিয়া সফরের সময়ও তার মনে হয়েছিল যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে এ ধরনের আলোচনা বা প্রত্যাশা নিয়ে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফিদানের সতর্কবার্তার মূল বিষয় ছিল—যেসব পরিস্থিতিকে মানুষ শুরুতে অসম্ভব বলে মনে করে, দীর্ঘ সংঘাতের চাপে সেগুলোই শেষ পর্যন্ত বাস্তব ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ডে দূরপাল্লার হামলা জোরদার করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দুই পক্ষের হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এর ফলে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনাও বাড়ছে। সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি শহর, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হামলার বিস্তার যুদ্ধের ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলাও সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তারের বিষয়টি সামনে এনেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর অন্যতম বড় হামলা হিসেবে বর্ণিত ওই ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে তুলনামূলকভাবে গভীর এলাকায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা মস্কোর জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়েছে এবং একই সঙ্গে রুশ প্রতিক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের ভূখণ্ডেও রাশিয়ার হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনীয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে রুশ কামানের গোলাবর্ষণে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসামরিক এলাকাগুলোতে রুশ হামলা এবং ইউক্রেনের পাল্টা আঘাত—দুই দিকেই প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন থেকে ছোড়া ৪৫৬টি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। তবে এসব ড্রোনের কতটি রুশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে, সে বিষয়ে মস্কো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ১২৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। যুদ্ধরত দুই পক্ষের দেওয়া এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে আকাশপথে হামলার মাত্রা যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংঘাতের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আরও বড় রুশ সেনা সমাবেশের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন করে প্রায় পাঁচ লাখ সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়ার পরিকল্পিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর নতুন সেনা সমাবেশ শুরু হতে পারে।
ব্রিটিশ একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, পুতিন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত নন এবং ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া নতুন সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার দাবি, নির্বাচনের পরপরই এই প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জেলেনস্কির এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই বর্তমানে দূরপাল্লার ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভর করছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ইউক্রেনের সম্মুখভাগে সীমাবদ্ধ নেই; রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তর, সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও শিল্প স্থাপনাও হামলার ঝুঁকিতে চলে এসেছে। এই পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল মস্কোর ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ালেও একই সঙ্গে বড় ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পারমাণবিক শক্তি এবং মস্কো অতীতে বিভিন্ন সময়ে পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কথা সামনে এনেছে। তবে পারমাণবিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ ফিদান তার বক্তব্যে দেননি। তার সতর্কবার্তা মূলত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
তুরস্কের এই সতর্কতা একই সঙ্গে ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাত ইতোমধ্যে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটলে তা শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব ইউরোপের নিরাপত্তা, ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া, বৈশ্বিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের নতুন সেনা সমাবেশের আশঙ্কা এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলা—দুই ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্তির পরিবর্তে আরও দীর্ঘ ও কঠিন সংঘাতে রূপ নিতে পারে। কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান অব্যাহত থাকলেও মাটির বাস্তবতা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সামরিক প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক সংঘাত কি আবারও বড় ধরনের আলোচনার পথে ফিরবে, নাকি পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়ে সংঘাতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে ভুল হিসাব, ভুল সংকেত বা অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। হাকান ফিদানের সতর্কবার্তা সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি নয়; বরং সংঘাত যখন অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে, তখন সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। তাই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে সামরিক সংঘাত কমানোর পাশাপাশি পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে রাশিয়া, সতর্ক করলেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
