যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল গাজা নিয়ে একটি নতুন সমঝোতা বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় একমত হয়েছে, যা তার ভাষায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। একই সময়ে হামাস জানিয়েছে, যদি ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তির সব শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করে, তবে সংগঠনটি নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি সমঝোতা বাস্তবে রূপ নিলে তা গাজা সংকটের কূটনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
এদিকে ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত কীভাবে উত্তেজনামুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে যাতে সংঘাত দ্রুত শেষ করার জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকতে পারে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ইরানের ভেতরে নতুন কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি, যা সাময়িকভাবে সামরিক পরিস্থিতিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। কুয়েত জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে একটি বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে চালানো একটি ইরানি হামলা তারা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে মিসর জানিয়েছে, দামিয়েত্তা বন্দরে দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনার পর এই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো তাদের ভূখণ্ডে একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি এবং মিসরীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল উত্তেজনা ক্রমেই বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান বিজয় অর্জন করেছে। তিনি বলেছেন, এখন দেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এই বিজয়কে সুসংহত করা এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নথিভুক্ত করা। পার্লামেন্টের কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে তিনি আরও বলেন, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও জাতীয় শক্তি নিশ্চিত করতে হলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঐক্য আরও দৃঢ় করতে হবে। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জাতীয় সংহতিকে ভবিষ্যৎ কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে একটি নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের সামরিক অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৩০০, তা কমে ৮২৭টিরও নিচে নেমে এসেছে। একইভাবে THAAD ইন্টারসেপ্টরের মজুদও ৪৫২ থেকে কমে ২৭৮টির নিচে নেমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই মজুদ পুনর্গঠনে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে, যা ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ অন্য কোনো বড় সামরিক সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই ঘাটতি পূরণে পেন্টাগন ২০২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৬৭ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিলের মধ্যে ১৮.২ বিলিয়ন ডলার প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং THAAD প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় সংগ্রহের জন্য বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি ২০২৭ অর্থবছরের প্রাথমিক বাজেট প্রস্তাবে তুলনামূলক কম দামের যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন ও সংগ্রহ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি, ইরানকে ঘিরে চলমান কৌশলগত হিসাব-নিকাশ, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হবে নাকি নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ।
যুদ্ধবিরতির শর্ত মানলে নিরস্ত্রীকরণে প্রস্তুত হামাস, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা
