কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চীনের নেতৃত্বে ২৯টি দেশ নিয়ে গঠিত নতুন আন্তর্জাতিক জোট ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ বা ওয়াইকো (WAICO) আত্মপ্রকাশ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি ব্যবস্থার একটি বিকল্প কাঠামো তৈরির চীনা প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক এক শীর্ষ সম্মেলনে ওয়াইকোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। শি জিনপিং তার বক্তব্যে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কোনো একটি দেশের একক নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত নয়; বরং বিশ্বের সব দেশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, “এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের আধিপত্য এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।” যদিও তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন বেইজিং।
গত কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এআই গবেষণা, উন্নত মডেল তৈরি এবং আধুনিক কম্পিউটিং অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম খরচে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয় নয়, বরং এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এ কারণে ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়েই এই খাতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
চীনের দাবি, এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশ্বের সব দেশের সমান সুযোগ থাকা উচিত। বেইজিং অভিযোগ করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও এআই চিপের সরবরাহে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করছে। চীনের মতে, এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
ওয়াইকো জোটের মাধ্যমে চীন মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআই প্রযুক্তির সহযোগিতার আওতায় আনতে চাইছে। বর্তমানে আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু দেশে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বেইজিং বলছে, তারা ওপেন সোর্স প্রযুক্তির মাধ্যমে এআই উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে এবং সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াবে।
জোটটিতে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল এবং পাকিস্তানের মতো দেশ রয়েছে বলে জানা গেছে। চীনের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ গোলার্ধের আরও অনেক দেশকে এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক এআই নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়।
জাতিসংঘ আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। চীন আশঙ্কা করছে, এসব নীতিমালায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বেশি থাকবে। তাই ওয়াইকোর মাধ্যমে একটি বিকল্প কণ্ঠ তৈরি করার চেষ্টা করছে বেইজিং।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও প্রযুক্তিগত জোট শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ এবং প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইসরাইল, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াইকো ও প্যাক্স সিলিকা—দুটি উদ্যোগই প্রমাণ করছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ তথ্য, শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ। চীন এই ক্ষেত্রে বড় ধরনের সক্ষমতা তৈরি করেছে। দেশটির বিশাল শিল্পভিত্তি, কম খরচের বিদ্যুৎ এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের সক্ষমতা তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে। তবে উন্নত চিপ প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক এআই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
চিপ প্রযুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তির চিপ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যাতে চীনের সামরিক ও উচ্চ প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতি সীমিত রাখা যায়। অন্যদিকে চীন নিজস্ব চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বিশ্ব এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুইটি বড় ব্যবস্থায় বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি কাঠামো এবং অন্যদিকে চীনের নেতৃত্বাধীন বিকল্প জোট।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক অরিন্দ্রজিৎ বসুর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোকে ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। অনেক দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির প্রকৃত ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু রাজনৈতিক জোটের ওপর নয়, বরং উদ্ভাবন, গবেষণা, নিরাপত্তা এবং নৈতিক ব্যবহারের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি বৈশ্বিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প এবং অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু যদি এটি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে প্রযুক্তিগত বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।
চীনের নেতৃত্বে ওয়াইকো জোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে। আগামী দিনে এই দুই শক্তির প্রতিযোগিতা শুধু এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির নতুন ভারসাম্যও নির্ধারণ করতে পারে।
রাশিয়া-পাকিস্তানসহ ২৯ দেশের সঙ্গে চীনের জোট, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ
