প্রতিটি ঘটনাকেই চরম ধ্বংসাত্মক ভাষায় তুলে ধরার একটি প্রবণতা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের, আর এ কারণেই মার্ক লেভিনের মতো রক্ষণশীল বিশ্লেষকেরা তাঁকে শতাব্দীর সেরা প্রেসিডেন্ট বলে প্রশংসা করেন, তবে এই বেপরোয়া কৌশলই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের পতনের কারণ হতে পারে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে; সুয়েজ খাল যেমন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৃত্রিম নৌপথ, ঠিক তেমনি হরমুজ প্রণালিও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য, আর মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দেন তখন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান এবং নাসেরও পাল্টা জবাব দেন, এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিসরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সুয়েজ ক্যানেল ব্যবহারকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লন্ডন ১৫টি দেশের একটি সম্মেলন আহ্বান করে, কূটনীতি ব্যর্থ হতে দেখে ইডেন এমনকি নাসেরকে হত্যার কথাও ভেবেছিলেন, কিন্তু যখন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল মিলে খাল পুনর্দখল ও নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার হস্তক্ষেপ করে তা থামিয়ে দেন, কারণ একই সময়ে পূর্ব ইউরোপে হাঙ্গেরির বিদ্রোহ সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মমভাবে দমন করছিল এবং আইজেনহাওয়ার মনে করেছিলেন সুয়েজ সংকট একটি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত যা বড় সংকট থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারে; সে সময় যুক্তরাজ্যজুড়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন, ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে ব্রিটেন যা প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল শেষ পর্যন্ত তার উল্টো ফল হয়, জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় মিসর খালের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং নাসের আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়; এখন প্রশ্ন উঠছে ইরান সংকটও কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই ধরনের পরিণতি বয়ে আনবে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাথালি তোচ্চি মনে করেন ট্রাম্প হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ব্যতিক্রমী এক চরিত্র হলেও তিনি সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য কমতে পারে, আর যদি তা সত্যি হয় তবে ইতিহাসের বড় এক পরিহাস হবে কারণ যাকে অনেক সময় রক্ষণশীল ও পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে দেখা হয় সেই ইরানই হয়তো নতুন এক যুগের সূচনা ঘটাতে পারে; বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প একাধিক সংকটে জর্জরিত, তিনি প্রায়ই দাবি করেন অভিবাসীদের কারণে ইউরোপের সভ্যতা হুমকির মুখে, অথচ নিজেই হুমকি দিয়েছেন যে তার দাবি না মানলে হাজার বছরের পুরোনো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন এমন হুমকি বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়, ইরানে হামলার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কিছুক্ষণ আগে তিনি সামাজিক মাধ্যমে পিছু হটার ঘোষণা দেন; ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান পিছু হটেনি বরং লাখ লাখ মানুষ প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোতে অবস্থান নেয়, এতে হোয়াইট হাউসে চাপ তৈরি হয় এবং নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সম্মানজনকভাবে পিছু হটার উপায় খোঁজা শুরু হয়, যদিও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয় তবুও এর শর্ত নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি; একইসঙ্গে ট্রাম্প নিজ দলের ডানপন্থীদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন কারণ নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপরীতে গিয়ে তিনি এমন সংঘাতে জড়িয়েছেন যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথায় আস্থা রাখা, যিনি দাবি করেছিলেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে; আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়লেও ট্রাম্প ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধে চাপ দিতে দ্বিধা করছেন, যা দুই নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, তবে হোয়াইট হাউস জানে ইরান তাদের মিত্রদের সহজে ছেড়ে দেবে না এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি অথবা সংঘাত চালিয়ে যাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে, একসঙ্গে দুটো সম্ভব নয়; ফলে ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন যা হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোর মতো, যারা পার হওয়ার জন্য ইরানের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে, একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হুমকি দিলেও তা কোনো ফল দেয়নি বরং তার জনসমর্থন কমতে শুরু করেছে; বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতিও ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন চার ডলারে পৌঁছেছে এবং তেলের বাজারে বড় ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রবৃদ্ধি কমা ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে, অন্যদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে উচ্চ তেলের দামে রাশিয়ার বিপুল আর্থিক লাভ হতে পারে, উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতার ধারণাও দুর্বল হয়ে পড়ছে, জ্বালানি ও পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; ইরানের ভেতরে বোমা হামলায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, বেসামরিক নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বিস্ফোরণের ভয়াবহতা ও আতঙ্কের চিত্র উঠে এসেছে; অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই বছর শুরু করা ইরানে বড় বিক্ষোভ দেখা দিলেও তা কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে এবং এখন দেশটিতে সরকারপন্থী সমাবেশই বেশি দেখা যায়, ফলে সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে; একইসঙ্গে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন ইরান এখন আত্মবিশ্বাসী হলেও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ঝুঁকির কারণ হতে পারে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথাও বলেছেন, এ প্রস্তাব সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সমর্থন করলেও রক্ষণশীল মহল তীব্র বিরোধিতা করছে; অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে হতাশ হয়ে নতুন করে জোট সম্পর্ক নিয়ে ভাবছে, ইউরোপের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কারণ তাদের মতামত ছাড়াই এই সংঘাতে জড়ানো হয়েছে, ফলে তারা সমর্থন দিতে অনাগ্রহী, ট্রাম্প এ কারণে ইউরোপকে দোষারোপ করলেও এবার ২০০৩ সালের মতো ইউরোপ বিভক্ত হয়নি বরং অনেক দেশ একযোগে বিরোধিতা করেছে; সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে ইউরোপের জনগণের একটি বড় অংশ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘনিষ্ঠ মিত্র নয় বরং সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে চীনকেও অনেকেই হুমকি মনে করছে, ফলে আন্তর্জাতিক জোট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এখন শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয় বরং জনগণের মতামতের ওপরও নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
