কারাকাস, ৩১ আগস্ট ২০২৬: দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জ্বালানি উৎপাদন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২৫ বছরের একটি বড় ধরনের তেল চুক্তি করেছে ভেনেজুয়েলা। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রে উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তি ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বাড়ানো এবং দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা জাতীয় তেলশিল্পকে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চুক্তির আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের আনুমানিক মূল্য ৬৫ মার্কিন ডলার ধরে হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলা প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১৯ ডলার পাবে বলে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ২৫ বছরের পুরো চুক্তিকালজুড়ে বিভিন্ন রাজস্ব ও আয় থেকে ভেনেজুয়েলা সরকারের মোট আয় ২০৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের পরিবর্তন, উৎপাদনের মাত্রা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি অনুযায়ী প্রকৃত আয় কমবেশি হতে পারে।
চুক্তিতে তেলক্ষেত্র পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর জন্য ১৬ শতাংশ রয়্যালটি এবং ৩৪ শতাংশ আয়কর নির্ধারণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট হারে রয়্যালটি ও কর প্রদান করতে হবে। ভেনেজুয়েলার সরকারের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দুই পক্ষের দায়িত্বের বিভাজন। ভেনেজুয়েলা তার তেলসম্পদ, বিদ্যমান তেলশিল্পের অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি সরবরাহ করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, কারিগরি সহায়তা ও পরিচালনাগত দক্ষতা সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রদ্রিগেজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ভেনেজুয়েলার হাতেই থাকবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুতের অধিকারী দেশগুলোর অন্যতম ভেনেজুয়েলা। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগের ঘাটতি, তেলশিল্পের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনাগত সংকট, উৎপাদন সক্ষমতার অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন চুক্তির আওতায় প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পুরোনো তেলক্ষেত্র পুনরুদ্ধার, পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যাপক নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চুক্তিটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলসম্পদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন একদিকে জ্বালানি সরবরাহের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া তেল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত পুনরায় পূরণের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
এই চুক্তির রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও ব্যাপক। দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করেছে। এসব কারণে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। নতুন ২৫ বছরের চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভেনেজুয়েলার কৌশলগত তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব সম্পদ ও সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।
চুক্তির আওতায় বিদ্যমান ১৭টি তেলক্ষেত্রের পাশাপাশি আরও কয়েকটি নতুন তেল ব্লক উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমান পর্যায়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত সরবরাহ, তেলক্ষেত্র পুনর্গঠন এবং পরিবহন ও পরিশোধন অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত তেলশিল্পকে টেকসইভাবে পুনর্গঠন করা। দেশটির অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ অত্যন্ত ভারী প্রকৃতির হওয়ায় উত্তোলন, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই উৎপাদন দ্রুত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে বিনিয়োগের গতি, প্রযুক্তি সরবরাহ, তেলক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশের ওপর।
অর্থনৈতিক দিক থেকে চুক্তিটি ভেনেজুয়েলার জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দেশটি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে তেল রপ্তানি থেকে সরকারি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদকে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বছরের এই তেল চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। ভেনেজুয়েলার জন্য এটি দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা জাতীয় তেলশিল্প পুনর্গঠনের সুযোগ, আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলসম্পদসমৃদ্ধ দেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এখন মূল প্রশ্ন হলো—চুক্তির ঘোষিত বিনিয়োগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, উৎপাদন কতটা বাড়ানো সম্ভব হয় এবং এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঘোষিত বিপুল রাজস্ব বাস্তবে কতটা প্রবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর তাই এখন এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দিকে।
