জাপানে চলমান দক্ষ কর্মী সংকট মোকাবিলায় নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) ক্যাটাগরির ১৬টি খাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার, জাপান সরকার ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে এসএসডব্লিউর ১৬টি খাতে ৮ লাখ ২০ হাজার বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং এতে বাংলাদেশ সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে মোট চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩ লাখের বেশি জনশক্তি পাঠাতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, আগে এ ক্যাটাগরির মাত্র ছয়টি খাতে জনশক্তি পাঠানোর সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সব খাতেই দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাপান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতে জাপান বাংলাদেশের জন্য একটি আকর্ষণীয় শ্রমবাজার যেখানে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং সরকার সঠিকভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে; টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী জাপান ২০২৯ সালের মধ্যে দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক কর্মসংস্থান (ইএসডি) ও এসএসডব্লিউ ক্যাটাগরিতে প্রায় ১২ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে; বিশেষজ্ঞরা বলছেন জাপানে যাওয়ার আগে কর্মীদের জাপানি ভাষা শেখা এবং দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি, এতে জাপানি সমাজে বাংলাদেশের কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং একবার আস্থা অর্জন করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, এমনকি ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানের মোট চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত জনশক্তি বাংলাদেশ থেকে পাঠানো সম্ভব হতে পারে; এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যার মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি জাপানি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়ন, স্থানীয় প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, জাপানের সহায়তায় ভাষা শিক্ষক আনা, জাপানি স্কিল ট্রেনিংয়ের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং দেশব্যাপী ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ; এছাড়া বিএমইটির অধীনে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে জাপানি মানে উন্নীত করতে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বর্তমানে বিএমইটির আওতায় দেশের ৫৩টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে জাপানি ভাষা শিক্ষা চালু রয়েছে এবং ১৫টি টিটিসিতে অনলাইন বা হাইব্রিড পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, বেসরকারি খাতেও ২০০টির বেশি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে জাপানের অনুমোদিত ৯৫টি রিক্রুটিং এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে; নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সরকার প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যেমন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা নিয়োগ, জাপান ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিশেষ সহকারী নিয়োগ, ‘জাপান সেল’ চালু, পৃথক ওয়েবসাইট তৈরি, জনবল নিয়োগ এবং কার্যক্রম গতিশীল করা; টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাতে স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদা বুঝে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা যায়; একই সঙ্গে শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হয়েছে, ২০২৫ সালে ৪ হাজার শিক্ষার্থী জাপানে গেলেও ২০২৬ সালে তা ১০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তারা সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পাবে; কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া সহজ করতে রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্য ১৫ লাখ টাকা জমা রাখার শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, সহজ ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে এসব পদক্ষেপের ফলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হচ্ছে এবং জাপান বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে, যেখানে উন্নত মানবসম্পদ পরিবেশ, ভালো আয়, সামাজিক মর্যাদা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় সরকার ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি কর্মী সেখানে পাঠাতে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
