১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী প্রায় ৫০ বছর নীরবে তার জায়গা দখল করে নেয় খনিজ তেলভিত্তিক একটি নতুন কাঠামো, যার মাধ্যমে গড়ে ওঠে পেট্রোডলার ব্যবস্থা; সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘদিন বিষয়টি পরিষ্কার না থাকলেও হেনরি কিসিঞ্জার ও সৌদি আরবের গোপন সমঝোতার জোরেই বিশ্বে প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত সেই ব্যবস্থার দুর্বল দিক সামনে এনে দিয়েছে, একদিকে চীনের পেট্রো-ইউয়ানের উত্থান অন্যদিকে সৌদি আরবের নীরবভাবে পুরনো সমঝোতা থেকে সরে আসা—সব মিলিয়ে ডলারের শক্ত অবস্থানে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের প্রভাবকে নতুন করে আলোচনায় আনলেও অর্থনীতিবিদদের মতে বহুদিন ধরেই এই কাঠামো ভেতর থেকে দুর্বল হচ্ছিল এবং ১৯৭৪ সালের পর বর্তমান দশকই ডলারের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে ততই পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হচ্ছে, যদিও এখনও বিশ্ববাজারে ডলারের প্রভাব রয়েছে তবে তা আর একচ্ছত্র নয়; বিষয়টি বোঝার জন্য ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায় ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে এমন একটি সমঝোতা হয় যেখানে সৌদি আরব কেবল ডলারের বিনিময়েই তেল বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করবে, ১৯৭১ সালে স্বর্ণভিত্তিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বিশ্ববাজারে ডলারের চাহিদা ধরে রাখতে এই পথ বেছে নেয় এবং ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে, ফলে তেলকে কেন্দ্র করে ডলার দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে এবং তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের অর্জিত বিপুল ডলার যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে রাখতে শুরু করে, যার কারণে অন্যান্য দেশকেও তেল কিনতে ডলার ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়; এই প্রক্রিয়া প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ডলারের আধিপত্যকে শক্তিশালী করে রেখেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার স্থিতি বজায় রাখতে বিপুল রিজার্ভ ধরে রাখে ও মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগ করে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত এই ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে প্রকাশ করেছে, কারণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায় এবং এখন কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে; অর্থনীতিবিদদের মতে উপসাগরীয় দেশগুলো আগেই ধীরে ধীরে বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে শুরু করেছিল এবং ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রা ব্যবহারের মাধ্যমে পেট্রোডলারের একচেটিয়া প্রভাব ভাঙছে, বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ কমে যাওয়ার তথ্যও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় এবং বিকল্প হিসেবে ইউয়ান ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, সৌদি আরবও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি এবং নতুন আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি করছে; একইভাবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে তারা ডলারনির্ভরতা কমাতে শুরু করে এবং চীন-ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়, বর্তমানে ইরানের তেলের বড় অংশ চীন ক্রয় করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন হচ্ছে, বিশ্লেষকদের মতে এই প্রবণতা ডলারের প্রভাব কমিয়ে ইউয়ানকে শক্তিশালী করতে পারে; তবে পুরো ব্যবস্থাটি তাৎক্ষণিকভাবে বদলে যাবে না কারণ এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে পরিচালিত হয়, তবুও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা অনেক দেশকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে; এদিকে চীন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি ভোক্তা হিসেবে তারা বাজারে নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চায় এবং বিকল্প লেনদেন কাঠামো তৈরি করছে, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে; সব মিলিয়ে বর্তমান সংঘাত পেট্রোডলারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে—ইরান যদি প্রভাব ধরে রাখতে পারে তবে বিকল্প আর্থিক কাঠামোর পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র যদি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে তবে ডলারের আধিপত্য কিছুটা সময় আরও টিকে থাকতে পারে, তবে এখনই পেট্রোডলারের অবসান বলা যাবে না, বরং বলা যায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে একটি পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে যেখানে ডলার এখনও শক্তিশালী থাকলেও বিকল্প হিসেবে ইউয়ান ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে।
