দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে সংলাপ শুরু এবং দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সামরিক উত্তেজনা যাতে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কোরিয়ার মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে লি বলেন, সিউল পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খুঁজবে এবং ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া বর্তমান যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্থায়ী শান্তি কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে এগোতে চায়। তাঁর বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন দুই কোরিয়ার সম্পর্ক গভীর অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে এবং সামরিক উত্তেজনা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও দুই পক্ষের ভিন্ন নিরাপত্তানীতি কোরীয় উপদ্বীপকে দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত করে রেখেছে। লি বলেন, দুই কোরিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পথ খুঁজে দেখা উচিত। ১৯৫০-৫৩ সালের যুদ্ধ কোনো শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়নি; একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সামরিক সংঘাত থেমে যায়। ফলে সাত দশকেরও বেশি সময় পরও কোরীয় উপদ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। লির মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী অনিরাপদ কাঠামোর পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা সংঘাত প্রতিরোধ এবং সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। তিনি আরও বলেন, আলোচনার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সিউলের প্রস্তাবিত সংলাপ কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কোরীয় উপদ্বীপের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ইস্যু—উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিও আলোচনার অংশ হতে পারে। একই সময়ে লি স্পষ্ট করেছেন, উত্তেজনা কমাতে দক্ষিণ কোরিয়া আগাম ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেবে এবং পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এই নীতির লক্ষ্য হলো কূটনীতির দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা বজায় রাখা, যাতে আকস্মিক সামরিক বা রাজনৈতিক সংকট দ্রুত বড় সংঘাতে পরিণত না হয়। লির সর্বশেষ আহ্বান মূলত গত বছর দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা। তখন তিনি উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বাস্তবতাকে সম্মান করে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অনুসরণের কথা বলেছিলেন। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পিয়ংইয়ংয়ের পুরোনো আন্তঃকোরীয় পুনর্মিলন নীতি থেকে সরে এসে দক্ষিণ কোরিয়াকে তাঁর দেশের সবচেয়ে বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছেন। সিউল থেকে একাধিকবার আলোচনার প্রস্তাব এলেও উত্তর কোরিয়া সেগুলো প্রত্যাখ্যান বা সমালোচনা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেছে পিয়ংইয়ং। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে উত্তর কোরিয়া উসকানি হিসেবে অভিহিত করে আসছে। পিয়ংইয়ং এসব সামরিক তৎপরতাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। বিপরীতে সিউল ও ওয়াশিংটনের বক্তব্য হলো, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এই পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগই কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় লি জে মিয়ংয়ের প্রস্তাবকে কেবল একটি বৈঠকের আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি দুর্ঘটনাজনিত সামরিক সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ। উত্তর কোরিয়া আলোচনায় ফিরলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক ঝুঁকি কমানো, সামরিক আস্থা তৈরির পদক্ষেপ, সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার সামনে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধা রয়েছে। বিশেষ করে সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস দূর করা সহজ হবে না। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও লি তাঁর মুক্তি দিবসের ভাষণে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশকে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের কঠিন ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে, তবে একই সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে জাপানের সঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি নতুন যুগ শুরু করার আশাও প্রকাশ করেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ এবং জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর লির সমান গুরুত্ব উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য সিউলের বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তাঁর উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা শুধু পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে না; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শক্তির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আপাতত দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা স্পষ্ট—সিউল তার প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রেখেও কূটনীতির দরজা খোলা রাখতে চায় এবং যুদ্ধবিরতিনির্ভর বর্তমান কাঠামো থেকে একটি প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়। এখন মূল প্রশ্ন হলো, পিয়ংইয়ং সিউলের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরবে কি না। উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়াই আগামী দিনে দুই কোরিয়ার সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
