তেহরান — দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণা, উন্নয়ন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলা করে ইরান তার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা পরিবহন বিমান ‘সিমোর্গ’ (Simorgh)-কে পূর্ণাঙ্গ সনদ বা সার্টিফিকেশনের পথে এগিয়ে নিচ্ছে। ইরানের বিমান নির্মাণ খাতের জন্য এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখছে দেশটির কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প সফল হলে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ইরানের আকাশপথ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ইরানের বিমান নির্মাণ শিল্পের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে তৈরি এই টার্বোপ্রপ কার্গো বিমানটি ২০২৩ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করে। এরপর থেকে এর নকশা, ইঞ্জিন ব্যবস্থা, অ্যাভিওনিক্স ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক উন্নয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। বিমানটি প্রায় ৬ টন পর্যন্ত পণ্য বা সেনা পরিবহন করতে সক্ষম এবং প্রায় ৩,৯০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করার সক্ষমতা রয়েছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সিমোর্গ মূলত সামরিক সরবরাহ, সীমান্ত এলাকায় রসদ পরিবহন, দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা এবং জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ছোট রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণের সক্ষমতা থাকায় দুর্গম এলাকাতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিদেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তেহরানের দাবি, এই উদ্যোগ ইরানকে বিশ্বের সীমিত সংখ্যক দেশের কাতারে নিয়ে যাচ্ছে, যাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিবহন বিমান তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নতুন বিমানকে বাণিজ্যিক বা সামরিক ব্যবহারের জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হলে শুধু উড্ডয়ন সক্ষমতা নয়, বরং নিরাপত্তা পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব পরীক্ষায় সিমোর্গ কতটা সফল হয়, সেটিই এখন মূল বিষয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আধুনিক বিমান প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। দেশটি এর আগে বিভিন্ন সামরিক বিমান, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে স্বনির্ভরতার নীতি অনুসরণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সিমোর্গ প্রকল্প সেই কৌশলেরই একটি অংশ, যার লক্ষ্য হলো বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
ইরানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী বছরগুলোতে বিমানটি দেশটির পরিবহন বহরে যুক্ত হবে এবং সামরিক ও বেসামরিক উভয় খাতে ব্যবহার বাড়ানো হবে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর সফলতা নির্ভর করবে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা মান এবং কার্যকর ব্যবহারের ওপর।
নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে ড্রোনের পর নিজস্ব কার্গো বিমান তৈরিতে ইরানের সাফল্য
