যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক দলের সিনেটর জন ফেটারম্যান এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠক শুধু দুই নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ওয়াশিংটন-তেলআবিব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। রাজধানী ওয়াশিংটনের ব্লেয়ার হাউসে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ফেটারম্যানের অনানুষ্ঠানিক পোশাক পরিধান নিয়ে প্রোটোকল সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হলেও বৈঠকের মূল গুরুত্ব ছিল ইসরায়েলের প্রতি তার প্রকাশ্য ও দৃঢ় সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতার অভিন্ন অবস্থান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিনেটর ফেটারম্যানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের অন্যতম সাহসী এবং স্পষ্টভাষী সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন ইসরায়েলকে ঘিরে নানা বিতর্ক, সমালোচনা এবং কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে, তখন ফেটারম্যান সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভয়ে অবস্থান নিয়েছেন। নেতানিয়াহুর ভাষায়, ইসরায়েলের জনগণই শুধু নয়, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বিশ্বের বহু মানুষ তার এই ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞ।
জবাবে সিনেটর ফেটারম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানো তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয়। তিনি ইসরায়েলে একাধিক সফরের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে দেশটির উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিকের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে তার অবস্থান অতীতের মতো ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকবে।
ফেটারম্যান আরও বলেন, ইসরায়েলকে ঘিরে তার নিজ দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান তাকে হতাশ করেছে। তার মতে, দলের কিছু নেতার বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, দলীয় মতের সঙ্গে ভিন্নমত থাকলেও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসবেন না এবং প্রয়োজন হলে দলীয় অবস্থানেরও সমালোচনা করবেন।
গাজায় চলমান যুদ্ধ, হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের পাশাপাশি ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপকে তিনি আত্মরক্ষামূলক ও ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার দাবি, এসব পদক্ষেপের পেছনে যে নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতা রয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেকেই তা ভুলে গেছেন অথবা উপেক্ষা করছেন।
এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন গাজা উপত্যকার মানবিক পরিস্থিতি, জিম্মিদের মুক্তি, যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। একদিকে বহু দেশ যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে ফেটারম্যানের প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহু সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ডেমোক্র্যাটিক দলের একটি অংশ গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অন্য অংশ ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে। সিনেটর ফেটারম্যান সেই দ্বিতীয় ধারার অন্যতম উচ্চকণ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বৈঠকের সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আবারও ফেটারম্যানের প্রশংসা করে বলেন, কঠিন সময়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সহজ নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং সেই সম্পর্কে ফেটারম্যানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
এই বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করেছে যে, গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরানকে ঘিরে নীতিগত প্রশ্নে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য থাকলেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের প্রশ্নে এখনও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছেন।
হাফপ্যান্ট পরে পায়ের উপর পা তুলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করলেন মার্কিন সিনেটর
