সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়ে একটি নতুন বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির খসড়া তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির প্রযুক্তিগত ও নীতিগত আলোচনা ২০২৫ সালের অক্টোবরেই শেষ হলেও ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে হোয়াইট হাউস এখনো এতে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়নি। বিষয়টি এমন এক সময় সামনে এলো, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ আবারও তীব্র হয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া। আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রযুক্তিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলেও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদানে পরিণত হতে পারে। এ কারণেই অধিকাংশ দেশ নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে থাকে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলে এই প্রযুক্তি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পূর্বের মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তাহলে সৌদি আরবও একই পথ অনুসরণ করবে। সেই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বর্তমান চুক্তির খসড়াকে অনেক বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছেন। তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সৌদি আরবের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একই সঙ্গে এগোতে থাকলে পুরো অঞ্চলে নতুন ধরনের পারমাণবিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তদারকি ব্যবস্থা। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনাধীন কাঠামোতে আইএইএর প্রচলিত কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত না-ও থাকতে পারে। এমন হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য সৌদি আরবের নির্দিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞরা। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি এবং আলোচনার বিভিন্ন শর্ত পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা এ ক্ষেত্রেই ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত তথাকথিত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ পারমাণবিক চুক্তির উদাহরণ টানছেন। ওই চুক্তিতে আমিরাত স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের অধিকার ত্যাগ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক তদারকির কঠোর শর্ত মেনে নিয়েছিল। ফলে বর্তমান সৌদি চুক্তিতে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা না থাকলে তা বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন।
অন্যদিকে চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি, সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ, অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে উন্নত বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি অপরিহার্য। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পাবে এবং সৌদি আরবকে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে রাখাও সহজ হবে। তারা আরও সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি কঠোর অবস্থানের কারণে চুক্তি থেকে সরে আসে, তাহলে রিয়াদ বিকল্প হিসেবে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে আরও সহজ শর্তে পারমাণবিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবকে দুর্বল করতে পারে।
তবে বিরোধীরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত বা বাণিজ্যিক লাভের জন্য আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মানদণ্ড শিথিল করা হলে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি একাধিক দেশ সংবেদনশীল পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জন করে, তাহলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন এমন একটি সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে, যার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক পারমাণবিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত ভারসাম্যের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানকে ঠেকাতে এবার সৌদি আরবকে পারমাণবিক বোমার প্রযুক্তি দিচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
