কানাডাজুড়ে চলমান ভয়াবহ দাবানলকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্ত অতিক্রম করে দাবানলের ঘন ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, কানাডা তার বিশাল বনাঞ্চলের যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই ব্যর্থতার ফল হিসেবে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মার্কিন নাগরিক দূষিত বাতাসের শিকার হচ্ছেন। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই পরিস্থিতির কার্যকর সমাধান না করা হয়, তবে কানাডা থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরও উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্ট পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মূল্য কানাডাকেই বহন করতে হবে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন কানাডার একাধিক প্রদেশে শত শত দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে অন্টারিও, ম্যানিটোবা, সাসকাচেওয়ান, আলবার্টা এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে আগুন জ্বলছে। হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং শত শত দমকলকর্মী দিনরাত আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। তীব্র ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে বায়ুদূষণকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নিউইয়র্ক, মিনেসোটা, মিশিগান, উইসকনসিন, ইলিনয়সহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বায়ুর মান দ্রুত অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে কম বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, কানাডা বন ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করছে এবং সেই অবহেলার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, পর্যটন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র আর এই পরিস্থিতি নীরবে মেনে নেবে না। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত পরিবেশগত ব্যয় যোগ করে কানাডার পণ্যের ওপর আরও কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে কানাডা সরকার ট্রাম্পের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। অটোয়ার কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমান দাবানল কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর আমেরিকাজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার ফলে দাবানলের প্রকোপ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। কানাডা সরকার জানিয়েছে, বন সংরক্ষণ, আগুন প্রতিরোধ, জরুরি উদ্ধার অভিযান এবং অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে দাবানল মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এটি কোনো একটি দেশের সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দাবানলের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে এবং আগুনের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক চাপ বা শুল্ক আরোপের পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা, যৌথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জলবায়ু অভিযোজন এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত পরিবেশ নীতিই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশগত সংকটকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের ট্রাম্পের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা সম্পর্কের জন্য নতুন এক অনিশ্চয়তার সূচনা করতে পারে। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুল্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা, শিল্পনীতি এবং বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে একাধিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। দাবানলের ধোঁয়াকে কেন্দ্র করে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি সেই উত্তেজনাকে আরও গভীর করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটকে যদি রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সীমান্ত অতিক্রমকারী পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, দাবানল দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা।
কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, নতুন শুল্ক যুদ্ধের আশঙ্কা
