মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ইয়েমেনে হুথি বাহিনীর দ্রুত সামরিক অগ্রগতি, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, মক্কার কাছে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার সৌদি দাবি, বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত জলপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার খবর, সব মিলিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এসব ঘটনা ভবিষ্যতে সরাসরি ইরান-সৌদি, ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো বড় সামরিক সংঘাতে পরিণত হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথি বাহিনী কৌশলগত বন্দরনগরী মোকা এবং বাব আল-মান্দাবের মুখের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই অগ্রগতি লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথের ওপর তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক পরামর্শ হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ইয়েমেনি, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে ইরান হুথিদের সামরিক অভিযান সরাসরি পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব এখানেই। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই সংকীর্ণ জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটির নিরাপত্তা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিঘ্নিত হলে জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ রুটে যেতে হতে পারে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় ও যাত্রার সময় বাড়ে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের তেল পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা আরও তীব্র হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হুথিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। এর আগে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ওই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সবচেয়ে সংবেদনশীল ঘটনাগুলোর একটি হলো মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিত করার সৌদি ঘোষণা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, হুথিদের ছোড়া একটি ড্রোন মক্কার দক্ষিণে শনাক্ত করে নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়। সৌদি পক্ষ এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখেছে এবং মক্কা ও ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে হুথি পক্ষ সৌদি দাবিটি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনাটির উদ্দেশ্য ও দায় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
এই ঘটনার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও প্রকাশ্য হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান কায়রোতে বৈঠক করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতা বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরে নিরাপদ ও অবাধ নৌ চলাচলের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। সিসি সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি মিশরের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতা। দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM-এর মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে হুথিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সহযোগিতার লক্ষ্য হুথিদের সামরিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সৌদি আরবকে সহায়তা করা। একই বিষয়ে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি সরাসরি সৌদি-ইসরায়েল সামরিক জোট বা যৌথ যুদ্ধের ঘোষণা নয়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে ২০ হাজার MK-84 এবং ২০ হাজার BLU-117, অর্থাৎ মোট ৪০ হাজার ২,০০০-পাউন্ডের বোমা অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে এই অস্ত্র প্যাকেজকে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সহায়তার কোনো সরাসরি কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
এখানে ইরানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। হুথিরা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তাদের ইরান-সমর্থিত শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, হুথিদের পশ্চিম উপকূলের সামরিক অগ্রযাত্রায় ইরানি অস্ত্র ও পরামর্শের ভূমিকা ছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান হুথিদের সামরিক অভিযান সরাসরি পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক ও নিরাপত্তা চাপ যত বাড়বে, তাদের পেছনে ইরানের সমর্থনের প্রশ্নটিও তত বেশি সামনে আসতে পারে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনায় হামলার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে রিয়াদের নিরাপত্তা যোগাযোগ বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে গোয়েন্দা সহায়তার ওপর বেশি জোর দিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান। মিশর প্রকাশ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং লোহিত সাগরের নৌ চলাচলের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছে। পাকিস্তানও হুথিদের সৌদি হামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তান বা অন্য আঞ্চলিক দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য এখনো নেই।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সংঘাতের বিস্তার। বর্তমানে ইয়েমেনের যুদ্ধ, সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকট, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নৌ চলাচলের সমস্যা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে একটি দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সামরিক পদক্ষেপ অন্য দেশের নিরাপত্তা হিসাবকে বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে তেলবাজারে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার প্রভাব দেখা গেছে।
তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন বড় সামরিক অভিযান অনিবার্য, সেটি এখনই বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যাবে না। বরং বর্তমান ঘটনাগুলো এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ভুল হিসাব, নতুন হামলা বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের আঘাত সংঘাতকে দ্রুত আরও বিস্তৃত করতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৬ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ওমানের মাধ্যমে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি আলোচনার পথও এখনো সক্রিয় রয়েছে।
তাই মধ্যপ্রাচ্যের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি, সৌদি আরবের ওপর হামলা, বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উত্তেজনা সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিশর এবং অন্যান্য পক্ষের কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো এমন একটি পথ খোলা রাখছে, যার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু ইরানকে ঘিরে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ কী হবে, তা নয়। বরং হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল, বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে একই সঙ্গে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটিই আগামী দিনের বড় পরীক্ষা। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ইয়েমেনের সংঘাত আর কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।
