আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এটি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস এবং ড্যান্ডেলিয়ন ওয়ার্কসের গবেষণা প্রধান জুরি লিনেটস্কি। গত ৭ মে ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তারা বলেন, ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরায়েল, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের আয়োজন করেন, তখন এটিকে “নতুন মধ্যপ্রাচ্যের সূচনা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ডেনিস রস থেকে অ্যান্টনি ব্লিংকেন পর্যন্ত বহু মার্কিন কূটনীতিক ও বিশ্লেষক এই চুক্তিকে আঞ্চলিক শান্তির বড় পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাস্তবে এই চুক্তি শান্তির পরিবর্তে আরও গভীর উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। লেখকদের মতে, ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে তথাকথিত “আউটসাইড-ইন” কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই প্রক্রিয়া গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থানকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল ইরানকে মোকাবিলা করা। ২০২১ সালের ইসরায়েল রিলেশনস নরমালাইজেশন অ্যাক্ট এবং ২০২২ সালের ডিফেন্স অ্যাক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই জোটকে আরও সামরিক রূপ দেয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের আওতায় নিয়ে আসা হয়, যার ফলে ইসরায়েল, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধি পায়। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলার নামে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় ইসরায়েলের সামরিক কৌশল আরও শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে অস্ত্র বাণিজ্যও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং এর বড় অংশই ছিল আব্রাহাম অ্যাকর্ডসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে। ২০২৪ সাল নাগাদ ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির প্রায় ১২ শতাংশ এই দেশগুলোর কাছে পৌঁছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো আমিরাতের জন্য ড্রোন, সাইবার নজরদারি প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ শুরু করে। এমনকি ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে আমিরাতের অর্থায়নে গড়ে ওঠা সামরিক স্থাপনাতেও ইসরায়েলি গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠে আসে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মূলত ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত কয়েকটি কূটনৈতিক চুক্তির সমষ্টি, যার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, পরে সুদান ও মরক্কো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির নামকরণ করা হয় হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নাম অনুসারে, যিনি ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান—তিন ধর্মেই সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। চুক্তির আওতায় পারস্পরিক স্বীকৃতি, দূতাবাস স্থাপন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা হয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিরাপত্তা সহযোগিতাই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করেছে। ২০২৩ সালে দামেস্কে ইরানি জেনারেল হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালে ইরানি দূতাবাসে হামলার পর যে রকেট ও ড্রোন সংঘাত শুরু হয়, সেখানে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসভুক্ত কয়েকটি দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগও উঠে আসে। ইরানের পাল্টা হামলার সময় সৌদি আরব ও আমিরাত ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য ও রাডার সহায়তা দিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, বাইডেন প্রশাসনও এই চুক্তিকে সমর্থন অব্যাহত রাখে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য আগের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবানন ও গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, মানবিক সহায়তা বন্ধ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ বাড়ছে। লেখকদের মতে, ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান ছাড়া কেবল সামরিক জোট ও অস্ত্রনির্ভর কূটনীতি কখনোই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। প্রাক্তন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসবে না। তাদের মতে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এমন একটি কৌশলের প্রতীক, যা মূল সংকটকে পাশ কাটিয়ে সামরিক সমন্বয় ও অস্ত্র ব্যবসার ওপর নির্ভর করেছে। ফলে এই চুক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নতুন সংঘাত ও অস্থিরতার পথ আরও প্রশস্ত করেছে।
