ইরান-যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল যখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং তেলবাহী জাহাজগুলো এখনো নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তখন ইরান কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারকে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে প্রণালিটি অতিক্রমের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, বাগদাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও সরকারি চ্যানেলে বারবার অনুরোধ জানানোর পর তেহরান এই অনুমতি দিয়েছে। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালির কার্যত সীমিত হয়ে পড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ইরাকের তেল রপ্তানি, সরকারি রাজস্ব এবং বৈদেশিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। ইরাকি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ইরাকি তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি বাগদাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের ইরাক সফরের সময়ও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি শনিবার জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরাকি তেল বহনকারী কয়েকটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইরান সহযোগিতা করেছে এবং ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে হরমুজ ব্যবহার করে ইরাকি তেল রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বাগদাদ সতর্ক করে দিয়েছে যে পরিস্থিতি এখনো জটিল এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইরাক এই সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, কারণ দেশটির তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঐতিহাসিকভাবে পারস্য উপসাগরীয় জলপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করত; ফলে রপ্তানি পথের দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেশটির অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হওয়ায় সামরিক উত্তেজনা, জাহাজে হামলার আশঙ্কা কিংবা চলাচলে বিধিনিষেধ—সবকিছুই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্য ও সরবরাহের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় ইরাকি ট্যাংকারগুলোর জন্য বিশেষ অনুমতি তেহরান ও বাগদাদের মধ্যে একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে ইরান সম্ভবত দেখাতে চাইছে যে হরমুজ প্রণালিতে তার নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকলেও নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ও নির্দিষ্ট জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে আলোচনার ভিত্তিতে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ইরাক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হরমুজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প রপ্তানি পথ সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি জানিয়েছেন, বাগদাদ তুরস্কের জেইহান বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর এবং জর্ডানের আকাবা বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি শুরু করার পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে। এর অর্থ হলো, হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হলে ইরাক একদিকে ইরানের সঙ্গে সীমিত সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান সমুদ্রপথ সচল রাখার চেষ্টা করবে, অন্যদিকে স্থল ও বিকল্প সমুদ্রপথের মাধ্যমে নিজের তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার জন্য নতুন অবকাঠামোগত ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে বিকল্প পথগুলো তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজের সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পাইপলাইন সক্ষমতা, বন্দর সুবিধা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছুর ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে ইরাকি তেলবাহী জাহাজকে সীমিত অনুমতি দেওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতির বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। হরমুজ প্রণালিতে পরিস্থিতি যদি আরও দীর্ঘ সময় অনিশ্চিত থাকে, তাহলে ইরাকসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদক দেশগুলোকে বিকল্প রপ্তানি রুটের ওপর দ্রুত নির্ভরতা বাড়াতে হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দামেও নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ইরানের এই বিশেষ অনুমতি তাই একদিকে বাগদাদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধকালীন মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাস্তববাদী কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেটিও স্পষ্ট করেছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ইরাকের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
