ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইরাকের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে তাদের গভীর সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠন এবং ইরাকের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর কিছু নেতা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক, সরকারবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক, মানবাধিকারকর্মী এবং ইরানের সমালোচকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যা, অপহরণ, গুম, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও দমন-পীড়নের অভিযান চালিয়ে আসছে। যদিও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলো ইরাকের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরছে, যেখানে রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক এতটাই গভীর যে তাদের পৃথক করে দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই কৌশলের ফলে ইরাকের স্বেচ্ছাসেবী গণসমাবেশ বাহিনী আজ কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করা বা তাদের প্রভাব কমিয়ে আনা শুধু সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি ইরাকের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বহুবার বাগদাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব সীমিত করা হয়। তবে ইরাকের সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এমন পদক্ষেপ কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে এই বাহিনী বিলুপ্ত করতে পারবেন না, এমনকি কোনো প্রভাবশালী ধর্মীয় নির্দেশও এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না, কারণ এই বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা রাজনৈতিক দলগুলো আইনসভায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রেখেছে এবং নিজেদের শক্তির ভিত্তি দুর্বল করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত সমর্থনের সম্ভাবনা খুবই কম।
বিশ্লেষকদের আরও মতে, পশ্চিমা দেশগুলোও ইরাককে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে চায় না। কারণ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান, ব্যাপক মানবিক সংকট, শরণার্থী প্রবাহ এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রয়োজনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইরাককে নতুন সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে বলে বহু নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পুরো বাস্তবতা ইরানের প্রয়াত সামরিক কৌশলবিদ কাসেম সোলেইমানির বহু বছরের পরিকল্পনারই প্রতিফলন। তিনি নিহত হলেও তার গড়ে তোলা আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক, সমন্বয় ব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রভাব আজও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বর্তমান সংঘাত কেবল সামরিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি বহুমাত্রিক রূপ, যার প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গভীর ছাপ ফেলতে পারে।
ইরাকে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর প্রভাব কমানো কঠিন, বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
