ওয়াশিংটন: ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়া বর্তমান সংকটে তেহরানকে সামরিক সহায়তা দেবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যদি বেইজিং বা মস্কো কোনোভাবে ইরানকে সহায়তা করে, তবে তার পরিণতি ওই দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত নেতিবাচক হবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলে রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, বেইজিংয়ে সাম্প্রতিক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে না বা সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, শুধু চীনা সরকার নয়, দেশটির বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও এই অবস্থান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। একই পোস্টে তিনি বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও তাকে অনুরূপ আশ্বাস দিয়েছেন এবং বর্তমান সংকটে রাশিয়া কিংবা চীন কেউই ইরানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে লেখেন, “যদি তারা তেমনটা করে, তাহলে তা তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই খুব খারাপ হবে।”
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ইরানকে রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি মনে করি না তারা ইরানকে সাহায্য করছে। আমি তাদের ওপর আস্থা রাখি।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি কূটনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে মস্কো ও বেইজিংয়ের প্রকাশিত অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং অন্তত প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনতে চান না।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অবস্থানের একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহে সিনেটের এক শুনানিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, রাশিয়া ও চীন বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানকে সহযোগিতা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন রয়েছে। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বা প্রমাণ প্রকাশ করেননি, তবুও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত কার্যক্রমে ওই দুই দেশের কোনো না কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এর ফলে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগনের প্রকাশ্য বক্তব্যের মধ্যে সূক্ষ্ম হলেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুর দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সিআইএ-সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে, রাশিয়া ইরানকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা সহায়তা অথবা ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিন কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার অভিযোগ করেছে যে ইরানের প্রতিরক্ষা খাত, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রমে সহায়তার অভিযোগে রাশিয়া ও চীনের বেশ কয়েকটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি রোধ করা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অস্ত্র সংগ্রহের পথ বন্ধ করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য একদিকে যেমন চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর তার আস্থার বার্তা বহন করে, অন্যদিকে এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তাও, যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ইরানকে সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা প্রদান করলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য ভবিষ্যতে মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নেরও জন্ম দিতে পারে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ইরানকে ঘিরে চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
ইরান ইস্যুতে চীন-রাশিয়াকে ট্রাম্পের কড়া সতর্কবার্তা, সহায়তা করলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’
