বিশ্ব জ্বালানি বাজার যখন ইতোমধ্যেই অস্থিরতার চরম পর্যায়ে, ঠিক সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত হঠাৎ করেই ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সঞ্চার করেছে; মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম-এর বরাতে প্রকাশিত এই ঘোষণাটি এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে, ফলে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে; বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী—যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়—সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে, এবং দীর্ঘদিন ধরে ইরানি হুমকি, জাহাজে হামলার আশঙ্কা ও সামরিক উত্তেজনার কারণে এই রুট দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে; এই প্রেক্ষাপটে আমিরাত অভিযোগ করেছে যে, চলমান সংকটকালে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত সহযোগিতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশটিকে জোট থেকে বেরিয়ে আসার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন; ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেক দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক তেল বাজারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে এবং বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই জোটভুক্ত দেশগুলো থেকে আসে, ফলে আমিরাতের মতো একটি প্রভাবশালী উৎপাদক দেশের প্রস্থান শুধু জোটের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যই নষ্ট করবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ নীতিমালা, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদন কৌশলকে নতুন করে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি করবে; ওয়াম জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত মূলত আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অর্থনৈতিক রূপকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য হলো জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং দেশীয় বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা, একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে একটি দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা; এছাড়া সরকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই পদক্ষেপটি জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক বাজারে জরুরি চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে; বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে পৃথক উৎপাদক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে আরও স্বাধীনভাবে উৎপাদন ও রপ্তানি নীতি নির্ধারণে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তেলের দাম, সরবরাহ নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
