দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া ও জাপানের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে রাখা কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিরোধকে অতিক্রম করে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছে টোকিও। জাপানের কৌশলগত হিসাব ছিল, মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধকে একমাত্র সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে দুই দেশের অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থের জায়গাগুলো সামনে আনা গেলে রাশিয়াকে বোঝানো সম্ভব হতে পারে যে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় মস্কো ও টোকিওর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে পারে। তবে এই কৌশল বাস্তবায়নের পথে ইতিহাস, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাশিয়া-চীন সম্পর্কের গভীরতা বড় ধরনের বাধা হয়ে রয়েছে।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপানের ক্ষোভের শিকড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার মাত্র দুই দিন পর সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেই সময় জাপান আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং সোভিয়েত নেতৃত্ব যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ দেখেছিল। যুদ্ধ ঘোষণার পর সোভিয়েত বাহিনী দ্রুত পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করে এবং জাপানের নিয়ন্ত্রণাধীন কুরিল দ্বীপপুঞ্জেও প্রবেশ করে।
জাপানের আত্মসমর্পণের পরও সোভিয়েত বাহিনীর অভিযান থামেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ওপর সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে দ্বীপগুলো থেকে জাপানি জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে সরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় জাপানি স্থাপনা ও বসতিগুলোর অনেকগুলো ধ্বংস বা পরিবর্তিত হয় এবং বিভিন্ন রাস্তা ও গ্রামের নামও বদলে দেওয়া হয়। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও এই ভূখণ্ডগত পরিবর্তনের স্মৃতি জাপানের রাজনৈতিক ও জনমনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
আজ কুরিল দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ২১ হাজার মানুষ বসবাস করে এবং তাদের প্রায় সবাই রুশ নাগরিক। দ্বীপগুলো রাশিয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জাপান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কুরিলের চারটি দ্বীপ—ইতুরুপ, কুনাশির, শিকোটান এবং হাবোমাই—নিজেদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। রাশিয়া অবশ্য এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতাকে দ্বীপগুলোর বর্তমান অবস্থানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
এই বিরোধের কারণে মস্কো ও টোকিওর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা রয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিভিন্ন প্রচেষ্টা হলেও কুরিল প্রশ্ন বারবার আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সংলাপের সম্ভাবনা তৈরি হলেও ভূখণ্ডগত বিরোধ তাদের সম্পর্ককে একটি স্থায়ী সীমাবদ্ধতার মধ্যে রেখেছে।
তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য জাপানের কৌশলগত চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনা এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান নৌ ও বিমান উপস্থিতি টোকিওকে আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণ নতুনভাবে মূল্যায়নে বাধ্য করেছে। এই বাস্তবতায় রাশিয়াকে শুধু ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে বৃহত্তর এশীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করার চিন্তা সামনে এসেছে।
রাশিয়ার দিক থেকেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রুশ নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় বহর দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাশিয়া একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করেছে এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত যৌথ মহড়া পরিচালনা করছে। ফলে টোকিওর কাছে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি শুধু কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ভূখণ্ডগত বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানকে ঘিরে বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বুধবার একটি সামরিক মহড়া পর্যবেক্ষণ করেন রুশ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ক্রুজার ভারিয়াগ থেকে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের এই ধরনের ঘটনা টোকিওর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাপানের উত্তরাঞ্চল, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য এবং কুরিল দ্বীপপুঞ্জ—সবকিছুই বৃহত্তর উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চীনের উত্থান মোকাবিলায় রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব কমানোর কোনো বাস্তব সুযোগ আছে কি না। একদিকে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং পূর্ব এশিয়ায় ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে টোকিওর সম্পর্কের যেকোনো বড় পরিবর্তনকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
বিশ্লেষকদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ও জাপানের সম্পর্কের অবনতি। জাপান পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইউক্রেনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। রাশিয়াও পাল্টা জাপানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের পুরোনো বিরোধের সঙ্গে নতুন ভূরাজনৈতিক বিভাজন যুক্ত হয়েছে।
তারপরও কৌশলগত বাস্তবতা কখনও কখনও পুরোনো বিরোধকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। জাপানের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করতে পারে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলে মস্কো আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকবে। বিপরীতে, সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ রাখা গেলে রাশিয়ার ওপর চীনের প্রভাব কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব হতে পারে। এই ধারণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ তাই শুধু চারটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ নয়; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তরাধিকার, রাশিয়া-জাপান সম্পর্কের অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি এবং পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের প্রতীক। একদিকে টোকিওর ঐতিহাসিক দাবি, অন্যদিকে মস্কোর সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—দুইয়ের মধ্যে সমঝোতার জায়গা তৈরি করা কঠিন। তার ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফলে রাশিয়া ও জাপানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রশ্নটি এখন শুধু কুরিল দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বৃহত্তর একটি প্রশ্নে পরিণত হয়েছে—প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের শক্তি যত বাড়বে, রাশিয়া ও জাপান কি তাদের পুরোনো বিরোধের বাইরে গিয়ে নিজেদের অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ খুঁজে নিতে পারবে? নাকি ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া এবং বর্তমানের বৈশ্বিক শক্তির সংঘাত দুই দেশকে আরও দূরে ঠেলে দেবে? উত্তরটি নির্ভর করবে মস্কো-টোকিও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কূটনীতি, রাশিয়া-চীন অংশীদারত্বের গতিপথ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিরোধ পেরিয়ে রাশিয়া-জাপান: প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের উত্থান ঘিরে নতুন কৌশলগত সমীকরণ
