অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধকে ঘিরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটসের সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। উত্তর গাজা সফরকালে ব্যাপক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অঞ্চল পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তার মধ্যে “ভালো অনুভূতি” সৃষ্টি হচ্ছে। এই মন্তব্যের পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে গাজার বর্তমান অবস্থা কোনো আকস্মিক যুদ্ধপরিস্থিতির ফল নয়, বরং এটি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নীতির অংশ, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হুমকি স্থায়ীভাবে নির্মূল করা। তার এই বক্তব্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, কূটনৈতিক মহল এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
উত্তর গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তার অনুভূতি কী। এর জবাবে কাটস বলেন, “একটি ভালো অনুভূতি, তাই নয় কি?” তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল অতীতের সামরিক নীতি থেকে সরে এসেছে। আগে সেনাবাহিনী গাজায় অভিযান চালিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর ফিরে আসত, কিন্তু এখন কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিকল্পনায় সেনাবাহিনী গাজার ভেতরে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান করবে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বহু স্থাপনা ও অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও জানান, ইসরায়েল গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে সামরিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার লক্ষ্যে তিনটি নতুন সামরিক আউটপোস্ট বা সেনা ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব ঘাঁটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে।
কাটসের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় বিভিন্ন রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বারবার বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস এবং মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। গাজার হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ইতোমধ্যেই বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা তদন্ত ও মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে যে তাদের সামরিক অভিযান হামাসসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সীমান্তে হামলার ঝুঁকি কমাতে এবং নিরাপত্তা হুমকি প্রতিরোধে নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইন, দখলকৃত ভূখণ্ডের মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গাজাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের এই নতুন কৌশল শুধু যুদ্ধের সামরিক দিকই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
