গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টায় যুক্ত কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কে চলমান একটি ফৌজদারি মামলার অংশ হিসেবে তাঁর গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে তুরস্ক। শুক্রবার তুর্কি কর্তৃপক্ষ জানায়, মামলাটির আওতায় নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিকভাবে শনাক্ত ও সাময়িকভাবে গ্রেপ্তারের জন্য রেড নোটিশের আবেদন করা হবে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; বরং কোনো সদস্যদেশের অনুরোধের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত, অবস্থান নির্ধারণ এবং প্রত্যর্পণ বা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে আটক করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। তবে কোনো দেশের করা আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয় না; ইন্টারপোল তার বিধি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রতিটি অনুরোধ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। তুরস্কের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন গাজায় চলমান সংঘাত, বেসামরিক হতাহত এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টায় বাধা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আইনি ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরে তুরস্ক ইসরায়েলের ৩৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। ওই তালিকায় নেতানিয়াহুর পাশাপাশি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান এয়াল জামির এবং নৌবাহিনীর কমান্ডার ডেভিড সালামার নামও ছিল। তুরস্কের বিচার মন্ত্রণালয় তখন বাকি ৩২ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেনি; তবে তাদেরও জ্যেষ্ঠ সরকারি বা সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তুর্কি কর্তৃপক্ষের অবস্থান অনুযায়ী, ওই ৩৭ ব্যক্তি তুরস্কের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাদের গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে হবে। নতুন করে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়ার উদ্যোগ তাই শুধু তুরস্ক-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উত্তেজনাকেই আরও বাড়াতে পারে না, বরং গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিচার, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে চলমান বৃহত্তর আইনি বিতর্ককেও আরও তীব্র করতে পারে। আঙ্কারার এই পদক্ষেপের ফলে নেতানিয়াহু ও অন্যান্য ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং বিভিন্ন দেশে তাদের সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রেড নোটিশ জারি হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণ করবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক দেশের নিজস্ব আইন ও বিচারিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। তুরস্কের এই উদ্যোগকে দেশটির গাজা-সংক্রান্ত কঠোর অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যেখানে আঙ্কারা ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি উভয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। এদিকে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তুরস্কের অভিযোগ এবং সম্ভাব্য ইন্টারপোল উদ্যোগ বাস্তবে কতদূর অগ্রসর হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজরদারির বিষয় হয়ে উঠেছে।
